ইরানের সঙ্গে ইসলামাবাদে প্রথম সরাসরি আলোচনার সময় গত মাসে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবরোধ বসায় যুক্তরাষ্ট্র। এবার যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক তেহরানে পাঠিয়ে তারা হরমুজ উন্মুক্ত করার অভিযানে নেমেছিল। সে অনুযায়ী প্রণালিটির দিকে ছোট যুদ্ধজাহাজ বা ডেস্ট্রয়ার নিয়ে এগোলে ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়ে তারা। ইরানের উপকূলীয় বিভিন্ন দ্বীপ ও অঞ্চলে বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ অবস্থায় গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি বড় ঝুঁকিতে পড়ে। আকস্মিকভাবে আবারও তৈরি হয় যুদ্ধের আবহ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে সংঘর্ষ সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখনও বলবৎ আছে।
বিবিসি জানায়, হরমুজ প্রণালি ঘিরে এ সংঘর্ষের জন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরান তাদের তিনটি যুদ্ধজাহাজের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌকা থেকে হামলা চালিয়েছে। তারা এটিকে ‘উস্কানিহীন হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘আজ আমাদের সঙ্গে ছেলেখেলা করেছে।’
জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ইরানের জনগণ কখনও চাপের কাছে মাথা নত করে না।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির দিকে এগিয়ে আসা ইরানের একটি তেলের ট্যাঙ্কার ও আরেকটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। সেই সঙ্গে তারা বেশ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় ‘আকাশপথে হামলা’ চালিয়েছে।
এমন একসময় এ উত্তেজনা দেখা দিল, যখন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো একটি যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইরান। গত বৃহস্পতিবারই এ নিয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা। তবে গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু জানায়নি। ইউরোপ সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ নিয়ে তাদের অপেক্ষার বিষয়টি জানিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতি চললেও হামলা পাল্টা-হামলা কেবল এ দুই পক্ষের মধ্যে সীমিত নয়। গতকাল ভোরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ‘সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করছে’। পরে মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও তিনটি ড্রোন ছোড়া হয়েছিল। ফলে তিনজন ‘মাঝারিভাবে আহত’ হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রাথমিকভাবে গতকাল হরমুজ প্রণালিতে ‘বিস্ফোরণের’ খবর দেয়। তারা এটিকে ‘শত্রুপক্ষের সঙ্গে গোলাগুলি বিনিময়’ বলে বর্ণনা করে। স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, তেহরানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানান, গতকাল ইরানের উপকূলীয় বন্দর খামির, সিরিক ও কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে বলা হয়, তারা তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতি’ করেছে। হামলার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলছে তেহরান।
অন্যদিকে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের হামলাকে ‘উস্কানিবিহীন’ বর্ণনা করে বলেছে, মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারগুলো প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় ইরানি বাহিনী ‘একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট নৌকা’ দিয়ে হামলা চালিয়েছে। এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, তারা হুমকি নির্মূল করেছে এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার জন্য দায়ী ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে আছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র; কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং গোয়েন্দা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার মধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে আলজাজিরা জানায়, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে
চালানো ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন দুই হাজার ৭০০ জন। আহতের সংখ্যা আট হাজার ৫১২ জন।
তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে
মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চাপের মুখে পড়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, শান্তিচুক্তি নিয়ে আসায় দুদিন আগে তেলের দাম কমে যাওয়ার পর এ উল্লম্ফন ঘটল। বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মূল্যের সূচক ব্রেন্টের দাম ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার হয়েছে। হরমুজ নিয়ে উত্তেজনার বৃদ্ধির প্রভাব বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
চুক্তি না করলে আবারও হামলার হুমকি ট্রাম্পের
উত্তেজনার মধ্যেই সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একাধিক ছোট নৌকা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে এবং ইরানের হামলাকারীদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। আবারও সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আজ যেমন আমরা তাদের আবার ধরাশায়ী করেছি, ভবিষ্যতেও তাদের অনেক কঠিন ও আরও অনেক সহিংসভাবে ধরাশায়ী করব, যদি তারা দ্রুত চুক্তিতে সই না করে!’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, হোয়াইট হাউস বিশ্বাস করে, তারা ইরানের সঙ্গে একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইরানিরা কখনও চাপের কাছে মাথা নত করে না, বললেন আরাঘচি
যুদ্ধ শেষ করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গতকাল সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বেপরোয়া সামরিক অভিযানের’ জন্য অভিযুক্ত করেন। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি আক্রমণের পর মন্ত্রীর এটিই প্রথম মন্তব্য, যেখানে উভয় পক্ষই এক মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছে।
আরাঘচি বলেন, ‘যখনই কোনো কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ আসে, তখনই যুক্তরাষ্ট্র একটি বেপরোয়া সামরিক অভিযানের পথ বেছে নেয়। এটা কি চাপ প্রয়োগের একটি স্থূল কৌশল? নাকি কোনো বিঘ্ন সৃষ্টিকারীর দ্বারা (ডোনাল্ড ট্রাম্পকে) আবারও একটি চোরাবালিতে ফেলার ফল?’ তিনি বলেন, ‘কারণ যাই হোক না কেন, ফলাফল একই– ইরানিরা কখনও চাপের কাছে মাথা নত করে না এবং কূটনীতি সব সময়ই এর শিকার হয়।’
সম্প্রতি ইরানের সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তথ্য প্রকাশ করে। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখনও ৭৫ শতাংশ। আরাঘচি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির (যুদ্ধ শুরুর দিন) তুলনায় আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও উৎক্ষেপক ক্ষমতা ৭৫ শতাংশ নয়, সঠিক সংখ্যাটি হলো ১২০ শতাংশ।
পড়ুন:মির্জা ফখরুল-তামিম ইকবালসহ ১৫ জন পাচ্ছেন খালেদা জিয়া স্মৃতি স্বর্ণপদক
ইমি/


