দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামলেও কমছে না রোদের দাপট। তপ্ত বাতাসে যেন আগুন ঝরছে চারদিকে। গরমে ক্লান্ত মানুষ ছুটছেন একটুখানি স্বস্তির খোঁজে। এমন দহনময় সময়ে আখাউড়া পৌর শহরের সড়ক বাজারে পথচলতি মানুষের তৃষ্ণা ও ক্লান্তি মেটাচ্ছে তালশাঁস—গ্রামবাংলার চিরচেনা শীতল এক ফল।
বাজারের এক কোণে ছাতা টাঙিয়ে বসেছেন তাল বিক্রেতা মো. শাহাবুদ্দিন। সামনে সারি করে রাখা কাঁচা সবুজ তাল। ধারালো দা দিয়ে তাল কেটে মুহূর্তেই বের করে দিচ্ছেন স্বচ্ছ, নরম শাঁস। কেউ দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের জন্য প্যাকেট করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে।
শাহাবুদ্দিন বলেন, “সিজন মাত্র শুরু হইছে। এখনো পুরোপুরি তাল বাজারে আসে নাই। বড় তাল ৫০ থেইকা ৬০ টাকা আর মাঝারি-ছোট তাল ৩০ থেইকা ৪০ টাকায় বিক্রি হইতেছে।”
তিনি জানান, এসব তাল আসে বরিশাল, ভোলা ও চাঁদপুরের কচুয়া এলাকা থেকে। মৌসুমের শুরু হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি থাকলেও সামনে সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে বলে জানান তিনি।
প্রচণ্ড গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তালশাঁসের চাহিদাও বেড়েছে। বিশেষ করে দুপুরের দিকে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বেশি দেখা যায়। অনেকে কাজের ফাঁকে এসে তালশাঁস খেয়ে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আবার ফিরে যান কর্মস্থলে।
রোববার দুপুরে সড়ক বাজার ঘুরে দেখা যায়, রিকশাচালক, দিনমজুর, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অফিসগামী মানুষ—সব বয়সী মানুষের হাতেই দেখা মিলছে তালশাঁসের। কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, কেউ আবার ঠান্ডা পানির বদলে বেছে নিচ্ছেন এই প্রাকৃতিক শীতল ফল।
পৌরশহরের রাধানগর গ্রামের ব্যবসায়ি কালাম মিয়া বলেন, “এই গরমে ঠান্ডা কিছু না খাইলে শরীর টিকে না। ছোটবেলা থেইকা তালশাঁস খাই। এটা খাইলে শরীর ঠান্ডা লাগে।”
কলেজছাত্রী নাছিমা আক্তার মৌ বলেন, “ফ্রিজের কৃত্রিম ঠান্ডা পানীয়ের চেয়ে প্রাকৃতিক ফল অনেক ভালো। তালশাঁস খেলে শরীর সতেজ লাগে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কয়েক দিন ধরেই অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রয়েছে। ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েক গুণ।
এ বিষয়ে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হিমেল খান বলেন, “অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এ সময় বেশি বেশি পানি, ফল ও প্রাকৃতিক তরলজাতীয় খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তালশাঁস শরীরকে শীতল রাখতে সহায়তা করে। তবে বাইরে খোলা খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।”
বাংলার গ্রীষ্ম মানেই শুধু রুক্ষতা নয়, আছে কিছু চিরচেনা স্বস্তির গল্পও। কাঁঠাল, তরমুজ কিংবা ডাবের মতো তালশাঁসও সেই প্রশান্তিরই এক অনন্য অনুষঙ্গ। শহরের ধুলোমাখা ব্যস্ততার ভেতর তাল কেটে বের হওয়া স্বচ্ছ শাঁসে তাই যেন মিশে থাকে গ্রামের শীতল হাওয়া, আর ক্লান্ত মানুষের মুখে এনে দেয় এক চিলতে স্বস্তির হাসি।


