বিজ্ঞাপন

আইন লঙ্ঘন করে প্রশাসক পরিবর্তন এসআইবিএলের

একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা সংকটাপন্ন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল) প্রশাসক পরিবর্তন নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাংকটির অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিনকে সরিয়ে রংপুর অফিসে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসকের সঙ্গে কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তাকেও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের স্থলে নতুন প্রশাসক ও সহযোগী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ (এইচআরডি-১) থেকে জারি করা পৃথক দুটি কর্মচারী নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর-বাইরে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। কারণ ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন অনুযায়ী, রেজ্যুলুশন প্রক্রিয়াধীন ব্যাংকে প্রশাসক পরিবর্তনের ক্ষমতা শুধু ব্যাংক রেজ্যুলুশন বিভাগের হাতেই রয়েছে। কিন্তু মানব সম্পদ বিভাগ থেকে এই আদেশ জারি করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যে, এই বদলি কি আদৌ ‘আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়’ হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সদ্য কার্যকর হওয়া ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন ২০২৬’-এর উদ্দেশ্য ও কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাবেক মালিকপক্ষকে সুবিধা দিতে প্রশাসক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার অভিযোগও উঠেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এসআইবিএলের প্রশাসক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত রেজ্যুলুশন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান প্রশাসনিক নীতিমালার আওতায় নিয়মিত বদলির অংশ হিসেবেই করা হয়েছে।

গত বছর মে মাসে ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আওতায় এসআইবিএলসহ ৫ ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত এপ্রিলে সংশোধিত ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন-২০২৬ (১৮-ক ধারা যুক্ত করে) পাসের মাধ্যমে আগের মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখায় একীভূত ৫ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ইতোমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও উদ্যোক্তারা। এর মধ্যেই ব্যাংকটির প্রশাসক পরিবর্তন ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রশাসক পরিবর্তনের ঘটনা : বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারী নির্দেশ নং-এইচআরডি-১ : ২৫৪/২০২৬ অনুযায়ী, এসআইবিএলের অস্থায়ী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নির্বাহী পরিচালক মো. সালাহ উদ্দিনকে রংপুর অফিসে বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল বসারকে ব্যাংকটির নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই আদেশে আরও দুই নির্বাহী পরিচালককে বদলি করা হয়েছে। শামসুল আরেফীনকে খুলনা অফিসে এবং মো. ওবায়েদ উল্যা চৌধুরীকে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে বহাল করা হয়েছে।

অন্যদিকে কর্মচারী আদেশ নং-এইচআরডি-১ : ২৫৬/২০২৬ অনুযায়ী, এসআইবিএলের প্রশাসকের সহযোগী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত পরিচালক মো. রাশেদুল ইসলামকে কমন সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্ট-১-এ বদলি করা হয়েছে। তার জায়গায় ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-৯-এর কর্মকর্তা আছাদুল মোস্তফাকে প্রশাসকের সহযোগী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর ও একজন নির্বাহী পরিচালক প্রশাসক পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসক নিয়োগ ও অবসান, আইনে কী বলা আছে : ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন, ২০২৬-এর তৃতীয় অধ্যায়ে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ ও তার কার্যক্রম সংক্রান্ত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসক নিয়োগ সংক্রান্ত ধারা ১৯ অনুযায়ী, সংকটাপন্ন বা রেজ্যুলুশনের আওতায় থাকা তফসিলি ব্যাংকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একজন প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারে। এই প্রশাসক বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে এবং তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবেন। আশু সংশোধনমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রশাসকের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত হতে পারে। আর রেজ্যুলুশন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে তার মেয়াদ কতদিন হবে তা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই নির্ধারণ করবে।

প্রশাসকের অবসান নিয়ে ২৩ ধারায় বলা হয়েছে, কিছু নির্দিষ্ট কারণে প্রশাসকের দায়িত্ব শেষ হতে পারে বা তাকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে, প্রশাসক মারা গেলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে, তিনি পদত্যাগ করলে, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা আইন ও শর্ত মানতে ব্যর্থ হলে এবং দায়িত্ব পালনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হলে অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক যদি মনে করে তার মেয়াদ শেষ করা প্রয়োজন। কিন্তু সালাহ উদ্দিনকে কেন সরানো হলো, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কিনা, কিংবা তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন কিনাÑ এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, দুর্বল ব্যাংকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্বাধীন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতেই নতুন রেজ্যুলুশন আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসক ও সহযোগী কর্মকর্তাদের আকস্মিক বদলি সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বার্তা দিচ্ছে। তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক যদি এই পরিবর্তনের যৌক্তিক ভিত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের ভূমিকা স্পষ্ট না করে, তাহলে ভবিষ্যতে এসআইবিএলসহ অন্যান্য সংকটাপন্ন ব্যাংকের রেজ্যুলুশন কার্যক্রমও আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

রেজ্যুলুশন বিভাগের এখতিয়ার বনাম এইচআরডি-১ এর আদেশ ঘিরে আইনি বিতর্ক : প্রশাসক পরিবর্তনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এখতিয়ার নিয়ে। কারণ ‘ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইন-২০২৬’ এর ধারা ৬ অনুযায়ী রেজ্যুলুশন সংক্রান্ত ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পৃথক ‘রেজ্যুলুশন বিভাগ’ থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ এই আইনের আওতায় প্রশাসক নিয়োগ, অপসারণ বা নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ বলতে কার্যত ব্যাংক রেজ্যুলুশন বিভাগকেই বোঝানো হয়েছে। সে হিসেবে রেজ্যুলুশন প্রক্রিয়াধীন কোনো ব্যাংকের প্রশাসক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ওই বিভাগের মাধ্যমেই হওয়ার কথা। কিন্তু এসআইবিএলের প্রশাসক পরিবর্তনের আদেশ জারি করেছে এইচআরডি-১, যা মূলত একটি প্রশাসনিক বিভাগ। ফলে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আমাদের সময়কে বলেন, এসআইবিএলের প্রশাসক পরিবর্তনের বিষয়টি মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। মো. সালাহ উদ্দিনকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডেপুটেশনে প্রশাসক হিসেবে পাঠিয়েছিল। তবে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তার ঢাকার বাইরে বদলির সময় হওয়ায় বিদ্যমান ট্রান্সফার ও পোস্টিং নীতিমালার আওতায় তাকে রংপুর অফিসে বদলি করা হয়েছে। মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টিতে তিনি একজন নির্বাহী পরিচালক। ফলে অন্যান্য নির্বাহী পরিচালকদের মতো তার ক্ষেত্রেও বদলির নিয়ম প্রযোজ্য হয়েছে।

এইচআরডি-১ থেকে প্রশাসক পরিবর্তনের আদেশ জারির বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক রেজ্যুলুশন বিভাগ (বিআরডি) এবং এইচআরডি উভয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের অংশ। প্রশাসক ও প্রশাসক টিম যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়েই গঠিত, তাই তাদের ট্রান্সফার-পোস্টিং এইচআরডির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। তার মতে, এটি প্রশাসক প্রত্যাহারের বিষয় নয়; বরং একজন প্রশাসকের স্থলে আরেকজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসকের সঙ্গে যুক্ত অন্য কর্মকর্তাদেরও কেন সরানো হয়েছেÑ এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ট্রান্সফার-পোস্টিং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের অংশ। কোনো কর্মকর্তাকে অন্য বিভাগে প্রয়োজন হলে বা অন্য কাউকে তুলনামূলকভাবে বেশি উপযুক্ত মনে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অনুযায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে সাবেক মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখপাত্র মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পড়ুন:কারখানা সচল রাখতে নীতিগত সহায়তা চান পোশাকশিল্পের মালিকরা

দেখুন:‘ইউনূস সাহেবের আমলে খারাপ কাজ বেশি হয়েছে, সর্বনাশ বেশি হয়েছে’ |

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন