বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় ব্রাজিলের সমর্থন, ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন জানিয়েছে ব্রাজিল। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বের উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোয় (ব্রিকস) অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস দিয়েছে দেশটি।

শুক্রবার (১৫ মে) ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিমের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ব্রাসিলিয়ার ঐতিহাসিক পালাসিও দো প্লানালতোতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উভয়পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কৌশলগত অংশীদারিত্ব, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং গ্লোবাল সাউথের সংহতিকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

এদিন বৈঠকের শুরুতেই উপদেষ্টা আমোরিম প্রেসিডেন্ট লুলার বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ও জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল সাউথের একটি উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে অভিহিত করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রশংসা করেন।

এছাড়াও বৈঠকে উভয় নেতা বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের দীর্ঘ ৫৩ বছরের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। বৈঠকে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ব্রাজিল ছিল দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্র, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে দু’দেশের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং তা ধীরে ধীরে একটি বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে।

দ্বিপাক্ষিক ওই বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল উপদেষ্টা আমোরিমের ‘টেট-অ্যা-টেট স্ট্র্যাটেজিক ফোরাম’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব। তিনি বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের উপদেষ্টা পর্যায়ে নিয়মিত একান্ত বৈঠকের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দেন, যাতে দু’দেশের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ ও কৌশলগত সমন্বয় আরও গভীর হয়। উপদেষ্টা আমোরিম বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও নিয়মিত রাজনৈতিক বোঝাপড়া অত্যন্ত জরুরি।

জবাবে পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির প্রস্তাবকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানান। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আস্থা, কৌশলগত সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমন্বয় আরও সুদৃঢ় হবে।

দ্বিপাক্ষিক ওই বৈঠকে উপদেষ্টা আমোরিম প্রেসিডেন্ট লুলার পক্ষ থেকে জানান, ২০২৬ সালের ২ জুন নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির পদে নির্বাচনে বাংলাদেশকে ব্রাজিল আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করবে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ সাইপ্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

উপদেষ্টা আমোরিম বলেন, বাংলাদেশের প্রতি ব্রাজিলের এই সমর্থন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকা, অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতার প্রতি অঙ্গীকার এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রতিফলন।

জবাবে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ব্রাজিলের সমর্থনের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের প্রার্থিতা ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’- এই দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব যখন যুদ্ধ, বৈষম্য, জলবায়ু সংকট ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন জাতিসংঘকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি।

বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ-ব্রাজিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেই সঙ্গে তারা দু’দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোয় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে বিপুল সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনও অপর্যাপ্ত বলেও স্বীকার করেন তারা।

উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের অর্থনীতি পরস্পরকে পরিপূরক করতে সক্ষম। বাংলাদেশ ব্রাজিল থেকে তুলা, সয়াবিন, চিনি, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্রাজিলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও সিরামিক রপ্তানির সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়াতে পারে। এ সময় সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক সংযোগ, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৈঠকে উভয়পক্ষ চলতি বছরের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিতব্য ফরেন অফিস কনসালটেশনস (এফওসি) নিয়েও আলোচনা করেন। যেখানে কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত হবে বলে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করে।

এছাড়াও বৈঠকে উপদেষ্টা আমোরিম বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতিবেশী পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জানতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে ‘সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততার’ ভিত্তিতে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও যৌথ সমৃদ্ধিতে বিশ্বাস করে।


পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী শাসনের মতো কখনোই নতজানু বা আত্মসমর্পণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করবে না। বাংলাদেশের কূটনীতি হবে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, সক্রিয় এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উন্নয়নের স্বার্থে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে বদ্ধপরিকর।

অন্যদিকে দ্বিপাক্ষিক ওই বৈঠকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও উদীয়মান বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় অটল থাকবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও সংযোগ বৃদ্ধিতে চীনের সঙ্গে কৌশলগত অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। সেই সঙ্গে জ্বালানি, পারমাণবিক প্রযুক্তি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জবাবে উপদেষ্টা আমোরিম এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিল উভয়ই গ্লোবাল সাউথের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বহুমেরুকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি বলেন, বহুপাক্ষিকতা কেবল শক্তির ভারসাম্যের ওপর নয়, বরং নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।

এদিন বৈঠকে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিও উত্থাপন করেন এবং ব্রাজিলের সমর্থন কামনা করেন। জবাবে উপদেষ্টা আমোরিম বিষয়টি প্রেসিডেন্ট লুলার সঙ্গে আলোচনা করবেন জানিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবেন বলেও আশ্বাস দেন।

এ সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) সদস্য হলেও এখনও বাংলাদেশে ব্যাংকটির কোনো শাখা নেই। ফলে সীমিতসংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। কাজেই তিনি ঢাকায় এনডিবির একটি শাখা স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও কার্যকর করবে।

জবাবে উপদেষ্টা আমোরিম বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সেই সঙ্গে তিনি কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য, শিল্প উদ্ভাবন ও প্রতিরক্ষা গবেষণায় সহযোগিতার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। এ সময় উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, ইতোমধ্যে দু’দেশের মধ্যে ১০টি আইনগত দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং আরও ১৬টি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, কৃষি, শিক্ষা ও উদ্ভাবনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বৈঠকের শেষাংশে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও বহুপাক্ষিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। উপদেষ্টা আমোরিম জানতে চান, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ সন্তুষ্ট কিনা। জবাবে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্ব এখন ‘আস্থা পুনর্গঠন, কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এবং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতিসংঘ’ চায়, যা সত্যিকার অর্থে সবার জন্য কাজ করবে। এ সময় আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

এ বিষয়ে সম্মতি জানিয়ে উপদেষ্টা আমোরিম বলেন, জাতিসংঘকে টিকে থাকতে হবে বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এবং বহুপাক্ষিকতাকে পুনর্গঠন করতে হবে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, সংলাপ ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে। সবমিলিয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতা, কৌশলগত বোঝাপড়া এবং নবায়িত আস্থার পরিবেশে বৈঠকটি শেষ হয়।

কূটনৈতিক মহলে এই বৈঠককে ‘বাংলাদেশ-ব্রাজিল সম্পর্কের কৌশলগত পুনঃসূচনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, যা একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্লোবাল সাউথের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ঢাকায় আট কোম্পানীকে এসি বাস নামানোর অনুমতি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন