বিজ্ঞাপন

মেশিনে লোহার রিং ঢুকিয়ে ওজন বৃদ্ধি! কলমাকান্দায় ছাগল বিতরণে তুলকালাম

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দরিদ্র পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকার-প্রদত্ত ছাগল বিতরণ কার্যক্রমে চরম অনিয়ম ও ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ছাগলের ওজন বাড়িয়ে দেখাতে ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিনের ভেতরে লোহার রিং ঢুকিয়ে রাখার মতো অভিনব জালিয়াতির ঘটনা হাতেনাতে ধরেছেন উপকারভোগীরা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনতা ও ভুক্তভোগীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ক্ষুব্ধ জনতা সংশ্লিষ্টদের একটি কক্ষে আটকে রাখে বলেও জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৮ মে) উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে এ ছাগল বিতরণ কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়েছিল।

অভিযোগ উঠেছে, বিতরণ করা ছাগলের ওজন বেশি দেখানোর জন্য ওজনের ডিজিটাল মেশিনের ভেতরে অত্যন্ত চতুরতার সাথে চারটি লোহার রিং ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে ওই রিংগুলো বের করা হলে দেখা যায়, সেগুলোর ওজনই প্রায় এক কেজি সাতশো গ্রাম। অর্থাৎ, প্রতিটি ছাগল মাপার সময় প্রকৃত ওজনের চেয়ে প্রায় পৌনে দুই কেজি বেশি দেখাচ্ছিল মেশিনটি।

ডিজিটাল মেশিনে কারচুপির বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের স্টাফ রাহাত সাংবাদিকদের বলেন, ‍‘ওজনের ডিজিটাল মেশিনটি অফিসেরই। আমরা আজকেই প্রথম এটি ওপেন করেছি। ভেতরে রিং ঢুকানোর বিষয়টি আমি বুঝতে পারিনি। ফিটিংয়ের সময় হয়তো ভুল হয়েছে।”

তবে সরকারি অফিসের ডিজিটাল মিটারের ভেতরে কীভাবে আগে থেকেই লোহার রিং ফিট করা থাকল, তা নিয়ে জনমনে গভীর রহস্য ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

উপকারভোগী আদিবাসী পরিবারগুলো জানায়, প্রথমদিকে বিতরণ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক মনে হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাগলগুলোর জীর্ণ দশা এবং আকার দেখে তাদের সন্দেহ হয়। এরপর সরকারি ডিজিটাল মিটারের বাইরে অন্য মাধ্যমে ছাগলগুলো ওজন করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে।

দেখা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ছাগলের সর্বনিম্ন ওজন আট কেজি হওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ করা অধিকাংশ ছাগলের ওজন মাত্র সাড়ে তি কেজি থেকে ছয় কেজির মধ্যে। হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ছাগলের ওজন আট কেজির কাছাকাছি ছিল।

ভুক্তভোগী অলিভিয়া নংমিন, পূর্ণা রিছিল, রবি হাজং ও জয় পদ্ম হাংজসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা শুনেছি একটা ছাগলই সর্বনিম্ন আট কেজি হওয়ার কথা। এখন দেখছি দুইটা ছাগল একসাথে মিলায়াও সাড়ে সাত থেকে আট কেজি হচ্ছে না। আমাদের গরিবের হক এভাবে মেরে দেওয়া হচ্ছে।”

এ অনিয়মের পেছনে মূল ঠিকাদারদের অনুপস্থিতি এবং সাব-ঠিকাদারদের কারসাজিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার পক্ষের প্রতিনিধি সাগর বেপারি স্বীকার করেন, ‘আমি ৩০টি ছাগল এখানে এনেছি। এর মধ্যে ছয়-সাতটি ছোট ছাগল ছিল।’

অন্যদিকে টাঙ্গাইলের মূল ঠিকাদার রাসেলের কর্মচারী হোসেন আলী জানান, ‘আমাকে দিয়ে ছাগলগুলো পাঠানো হয়েছে। কিছু ছোট ছাগল থাকতে পারে।’

জালিয়াতি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কানিকা সরকার বলেন, ‘মূল ঠিকাদার সরাসরি এখানে আসেন না। তাদের সাব-ঠিকাদার ছাগল ও উপকরণ পৌঁছে দেন, আমরা অফিসিয়ালভাবে তা গ্রহণ করি। সকালে প্রথম পর্যায়ে দুইশো জনের মধ্যে একশো জনের কাছে বিতরণ সঠিক ছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ছাগল কমপক্ষে আট কেজি হতে হবে। যেসব ছাগলের ওজনে সমস্যা পাওয়া গেছে, সেগুলো অবশ্যই পরিবর্তন (রিপ্লেস) করে দেওয়া হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় আদিবাসী নেতা বদুয়েল কুবি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নের নামে যদি এভাবে প্রকাশ্যে অনিয়ম করা হয়, তাহলে সরকারের মহৎ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। আমরা এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’

খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম। তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখছি। প্রকৃতপক্ষে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

পড়ুন- পুলিশের এলিট ফোর্স হিসেবে থাকবে র‌্যাব, হচ্ছে নতুন আইন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন