বিজ্ঞাপন

হারানো সবুজ ও গ্যাস সংকট: নেত্রকোনার বিশ্বনাথপুরে আশার আলো ছড়াচ্ছে বায়োগ্যাস

এক সময়ের সবুজ-শ্যামল, পাখির কলকাকলিতে মুখরিত নেত্রকোনা জেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রাম। যে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ঘেরা ছিল আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু আর বাঁশঝাড়ে। জ্বালানির জন্য কাউকে এক পয়সা খরচ করতে হতো না; প্রতিবেশীর গাছের শুকনো পাতা আর লাকড়িই ছিল ভরসা। গ্রামীণ সৌহার্দ্যের এমন আবহ ছিল যেখানে গাছের ফল বা জ্বালানি পাতা ভাগাভাগিতে কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে বদলে গেছে সেই চিরচেনা চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অনিয়ন্ত্রিত কৃষি ব্যবস্থা এবং অসময়ের বন্যা-খরায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এখানকার কৃষকরা। যৌথ পরিবার ভেঙে তৈরি হচ্ছে একক পরিবার। আর আবাসন সংকটের জোগান দিতে গিয়ে নির্বিচারে কাটা পড়ছে বসতভিটার চারপাশের গাছগাছালি। ফলে একদিকে যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য, অন্যদিকে তীব্র হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট। বাধ্য হয়ে গ্রামের মানুষকে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস, যা অনেক সময় স্থানীয় বাজারেও মিলছে না। গ্যাসের জন্য ছুটতে হচ্ছে নেত্রকোনা জেলা সদরে।

“গাছ কাটার ফলে জ্বালানির যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এবং আমাদের পরিবেশকে বাঁচাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই।”

এই তীব্র জ্বালানি ও পরিবেশগত সংকট উত্তরণে অভিনব ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন বিশ্বনাথপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক মর্জিনা বেগম। তিনি গ্রামের যেসব বাড়িতে গরু, হাঁস ও মুরগির খামার রয়েছে, তাদের বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।

মর্জিনা বেগমের দূরদর্শী উদ্যোগে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘বারসিক’ (BARCIK)। বারসিক গত ছয় বছর ধরে এই গ্রামের পরিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

এই উদ্যোগেরই অংশ হিসেবে সোমবার (১৮ মে) বিশ্বনাথপুর এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে ‘বায়োগ্যাস তৈরি ও ব্যবহার’ বিষয়ক দিনব্যাপী ব্যবহারিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় গ্রামের ২০ জন প্রগতিশীল কৃষক ও কৃষাণী অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালাটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন নেত্রকোনা জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি উপস্থিত কৃষকদের অত্যন্ত সহজ ভাষায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের কারিগরি দিক, খরচ এবং এর বহুমুখী সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেন।

প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম জানান, গবাদি পশুর গোবর ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে খুব সহজেই পরিবারের নিত্যদিনের রান্নার গ্যাসের চাহিদা মেটানো সম্ভব। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত ‘স্লারি’ বা উপজাত অংশটি ফসলের মাঠের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর জৈব সার, যা রাসায়নিক সারের খরচ শতভাগ কমিয়ে দেবে। এটি একদিকে যেমন সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে পরিবেশকে রাখবে কার্বনমুক্ত।

“নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজে বাঁচি, পরিবেশকে বাঁচাই”- এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে বিশ্বনাথপুরের কৃষকরা এখন নতুন আশার আলো দেখছেন। গ্রামীণ নারীদের সিলিন্ডার গ্যাসের পেছনে বাড়তি টাকা খরচ এবং কাঠ-পাতার ধোঁয়ায় ফুসফুস নষ্ট করার দিন এবার ফুরোলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, বিশ্বনাথপুর গ্রামের বায়োগ্যাস মডেল যদি পুরো নেত্রকোনা জেলায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে তা বাংলাদেশের গ্রামীণ জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় মাইলফলক হয়ে থাকবে।

পড়ুন- বড় সংগ্রহ বাংলাদেশের, বিশ্বরেকর্ড গড়ে জিততে হবে পাকিস্তানকে

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন