নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমে চরম অনিয়ম ও প্রকৃত হতদরিদ্রদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ক্ষোভ প্রকাশ ও কড়া সতর্কবার্তা দেওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তর।
মাঠপর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছে এবং ঢাকা থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল মাঠে নেমেছে। এ দলটি গতকাল সোমবার (১৮ মে) থেকে আগামি ২০ মে পর্যন্ত তালিকা মাঠ পর্যায়ে কাজ করবে।
গত ১৬ মে কলমাকান্দা জেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “অনেক প্রকৃত অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষ এখনও তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন। যে ঘরে বসার একটি চেয়ার নেই, মাথার ওপর ছনের চালও নেই- এমন পরিবারও এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে; অথচ তুলনামূলক সচ্ছলদের নাম তালিকায় ঠিকই চলে এসেছে।”
নির্বাচনের সময় জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হেলথ কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করা হবে না। তথ্য সংগ্রহে গাফিলতি বা দায়িত্ব পালনে অবহেলাকেও দুর্নীতির সমতুল্য উল্লেখ করে প্রশাসনকে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অন্যথায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন ডেপুটি স্পিকার।
ডেপুটি স্পিকারের কঠোর বার্তার পরপরই প্রশাসনিক তৎপরতা দৃশ্যমান হয়। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, ফ্যামিলি কার্ডের অনিয়মের জেরে তাকে ছাড়া মাঠপর্যায়ের সব অফিসারকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, “ঢাকার অধিদপ্তর থেকে আসা ২০ সদস্যের প্রতিনিধিদল বর্তমানে কলমাকান্দায় অবস্থান করছেন। তারা ইতোমধ্যে প্রণয়নকৃত ৭৯৪ জনের তালিকাটি মাঠে গিয়ে সরাসরি যাচাই-বাছাই করছেন। যাচাই শেষে প্রকৃত উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে এবং কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সার্বিক বিষয়ে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম জানান, ঢাকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত পরিচালকের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি কলমাকান্দায় এসেছে। তারা টানা তিন দিন এখানে অবস্থান করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
অন্যদিকে, নেত্রকোনা জেলা সমাজসেবা উপ-পরিচালক মো. শাহ আলম কলমাকান্দা অফিসের মাঠ কর্মকর্তাদের স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, চলমান তদন্ত ও যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকেও শিগগিরই প্রত্যাহার করা হবে।
হতদরিদ্রদের জন্য সরকারের এমন একটি মহতী উদ্যোগে সচ্ছলদের অন্তর্ভুক্তি ও প্রকৃত অভাবীদের বঞ্চনার খবরে ক্ষুব্ধ স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, ফ্যামিলি কার্ডের মতো মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে প্রকৃত দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও তথ্য গোপনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগের সুফল কখনোই প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। বর্তমানে ঢাকা থেকে আসা প্রতিনিধিদলের তদন্ত রিপোর্টের দিকেই তাকিয়ে আছেন কলমাকান্দাবাসী।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

