বাংলাদেশে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বরাবরই বিতর্কিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, এমন সুযোগ খুব বেশি সুফল মিলেনি বিগত সময়ে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সীমিত সুযোগ থাকছে, তবে শর্ত সাপেক্ষে।
তবে, প্রতিবছর জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক স্পেস ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত লেনদন গোপন, কম দামে দলিল ও নগদ অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহারে হাজার হাজার কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ তৈরি হয়। রাজস্ব হারানো এই অর্থ মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে আগামী বাজেটে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার।
মূলত রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের গ্যারাকল কিংবা মৌজা মূল্যের ফাঁদে অপ্রদর্শিত অর্থ ২০২৬-২৭ অর্থবছর বাজেটে শর্ত সাপেক্ষে বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। শর্ত হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতার উভয় পক্ষকে আয়কর রিটার্নের বিবরণে সম্পদের প্রকৃত মূল্যের ঘোষণা থাকতে হবে। তাহলেই কেবল প্রচলিত হারে কর পরিশোধ করে বৈধতা মিলবে।
যেমন- একজন ফ্ল্যাটের মালিক ২ কোটি টাকায় সম্পদ বিক্রি করলেন। ওই সম্পদের মৌজা রেট অনুযায়ী দলিল হলো ৬৫ লাখ টাকায়। স্বাভাবিভাবে সকল কাগজপত্রে ৬৫ লাখ টাকার বৈধ দলিল বা প্রমাণ থাকবে। বাকি ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকার কোনো বৈধ দলিল নেই। ওই টাকা বৈধ করতে হলে করদাতাকে আয়কর রিটার্নে পুরো ২ কোটি টাকাই দেখাতে হবে। যা বিক্রেতা ও ক্রেতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। মানে ক্রেতা ও বিক্রেতার উভয়েরই আয়কর রিটার্নে ঘোষণা থাকতে হবে। আর বিক্রেতাকে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বৈধ করতে প্রচলিত আয়কর স্ল্যাবে হিসাবে করে কর পরিশোধ করতে হবে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সরকার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত সর্বমোট প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বৈধ হয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকায় ২০২০-২০২১ সালে দেশের ইতিহাসের একবছরে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাদা করেছিলেন। এই বিনিয়োগ থেকে এনবিআর দুই হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। ওই বছরে মাত্র ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ মিলেছিল। তবে ২০২১-২২ অর্থবছর সুযোগ কিছুটা সীমিত করায় সাড়া বেশ কমে যায়। সে বছর মাত্র ২ হাজার ৩১১ জন করদাতা প্রায় ১ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা সাদা করেছেন।
অন্যদিকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবছর) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা সাদা করা হয়েছিল। সে সময় রেকর্ড ৩২ হাজার ৫৫৮ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সুযোগ গ্রহণ করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের (২০০৯-২০২৩) টানা তিন মেয়াদে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়, যার বড় অংশই এসেছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ কর হারে এই সুবিধাটি আবারও চালু করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে এই সুবিধা, বিশেষ করে দায়মুক্তির বিধানটি প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। তবে সেজন্য প্রযোজ্য হারে কর অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এবং প্রযোজ্য করের ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে এবং নিয়মিত করদাতাদের প্রতি বৈষম্য তৈরি করে মত দেন অর্থনীতিবিদরা। যেমনটা মনে করেন সিপিডি’র সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, কালো টাকা সাদার সুযোগে সামান্য পরিমাণ করের অর্থ সরকারি কোষাগারে আসে। আমি মনে করি, যারা সৎভাবে কর দেন তাদের জন্য বড় ধরনের অনুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি। একান্ত যদি দিতেই হয়, তাহলে প্রযোজ্য কর হারের সঙ্গে জরিমানা দিয়ে সাদা করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তবে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় দেশের আবাসন খাতে কোনও প্রশ্ন ছাড়াই কম কর দিয়ে অঘোষিত অর্থ (কালো টাকা) বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবি করে। গত ৮ এপ্রিল প্রাক-বাজেট আলোচনায় রিহ্যাবের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়, ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ যাতে প্রশ্ন তুলতে না পারে—এমন বিধান আয়কর অধ্যাদেশে পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। এতে অঘোষিত অর্থ আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং স্থবিরতা কাটিয়ে খাতটি পুনরুজ্জীবিত হবে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

