রাজধানীর পল্লবীতে ফুটফুটে কন্যাশিশু রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাসহ দেশব্যাপী অব্যাহত শিশু-নারী ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে নেত্রকোনা। শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শহরের ছোট বাজার এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, নেত্রকোনা জেলা সংসদ এ মানববন্ধনের ডাক দেয়।
কর্মসূচিতে নেত্রকোনার বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, প্রগতিশীল সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন হাতে অংশ নিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুত শাস্তির দাবি জানান।
উদীচীর এ মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এসে জড়ো হন। এতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, হায়দার-শেলি সংগীত বিদ্যানিকেতন, জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, প্রত্যাশা সাহিত্য গোষ্ঠী, প্রথম আলো বন্ধুসভা, হিমু পাঠক আড্ডা, নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ, নারী প্রগতি সংঘ, জনউদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ব্যানারসহ অংশ নেন।
জেলা উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীরের সঞ্চালনায় সমাবেশে জেলার শীর্ষস্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে প্রথম আলোর প্রতিনিধি ও প্রাবন্ধিক পল্লব চক্রবর্তী বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “আমরা নিজেদেরকে সভ্য হিসেবে দাবি করি। যে সমাজ শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সমাজ নারীর নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সমাজ মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না- সে সমাজ কখনো সভ্য হতে পারে না। আমরা এক ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কতটুকু বিচারহীনতার সংস্কৃতি হলে একজন বাবা তাঁর কন্যাশিশুর হত্যার বিচার চান না বলে খেদোক্তি প্রকাশ করেন! প্রতিটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যদি সুষ্ঠুভাবে আইনের যথার্থ প্রয়োগ হতো, তাহলে আর এসব বীভৎস ঘটনা ঘটতো না; আমাদেরও আজ রাস্তায় নামতে হতো না।”
সভাপতির বক্তব্যে জেলা উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খান ধর্ষকদের জন্য কঠোরতম আইনের দাবি তুলে বলেন, “ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। মানুষের সুরক্ষার জন্যই যদি আইন হয়ে থাকে, তবে সেই আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। নারীর সুরক্ষায় দেশে বিদ্যমান আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ অনেক সময় তাদের গ্রেপ্তার করলেও আইনি দুর্বলতার কারণে তারা দ্রুতই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধ করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের এখনই বের হয়ে আসতে হবে।”
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন প্রবীণ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল, জেলা উদীচীর সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাম্মেল হক, বিশিষ্ট লোকগবেষক আলী আহম্মদ খান আইয়োব, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক হারাধন সাহা, সংস্কৃতিকর্মী মাসুদুর রহমান খান, নারী প্রগতি সংঘের ব্যবস্থাপক মৃণাল চক্রবর্তী, ভাস্কর শিল্পী অখিল পাল, জেলা মহিলা পরিষদের সদস্য ফাহমিদা তোতা, নৃত্যশিক্ষক তমা রায়, জেলা যুব ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি জয় কুমার দে এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অরিত্রনিভা দে।
বক্তারা বলেন, দেশজুড়ে একের পর এক শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যেন আর কোনো রামিসাকে এভাবে অকালে প্রাণ হারাতে না হয়।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা ‘নারীর গর্ভে জন্ম নিয়ে নারীকে-ই ধর্ষণ?’, ‘শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত কর’ এবং ‘ধর্ষকের ফাঁসি চাই’ সম্বলিত বিভিন্ন স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। সমাবেশ থেকে দেশব্যাপী সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
পড়ুন- হামের চিকিৎসার জন্য দায়িত্বরত ডাক্তার-নার্সদের ঈদের ছুটি বাতিল


