স্থবির অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ প্যাকেজ ঘোষণা করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর পাশাপাশি কৃষি, সিএমএসএমই, পরিবেশবান্ধব ও সৃজনশীল অর্থনীতির খাতে ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। এতে উৎপাদন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গভর্নর বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তার ভাষায়, ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা বেরিয়ে গেছে, যেগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ বলা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যথাযথ জামানত বা
নথিপত্র নেই। এসব অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে সরকার এসব অর্থ ফেরত আনতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, রপ্তানি বাড়ানো আমাদের লক্ষ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো আমাদের লক্ষ্য।
কেন এই প্রণোদনা : বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানা চাপে রয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থ পাচার, আমানতকারীদের আস্থা সংকট এবং উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতের অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২ শতাংশে। আর আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে যেতে পারে।
এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, অর্থনীতিকে চাঙা করতে বড় আকারের ‘কাউন্টার-সাইক্লিক্যাল’ প্রণোদনা প্রয়োজন। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগ ও চাহিদা কমে গেলে রাষ্ট্রীয় সহায়তার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কোথা থেকে আসবে প্রণোদনার অর্থ : প্রস্তাবিত প্যাকেজের ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে গঠিত পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে। তিন বছরের বেশি মেয়াদি আমানতের ভিত্তিতে ১০ শতাংশ সুদে এই অর্থ সংগ্রহ করা হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে, যা সরকারি গ্যারান্টির আওতায় থাকবে।
ঋণের সুদহার কত : এই প্যাকেজের ভিত্তি সুদহার ধরা হয়েছে ১০ শতাংশ। এর মধ্যে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল সরবরাহ করবে এবং ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারবে।
বর্তমানে বাজারে ঋণের সুদহার যেখানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ, সেখানে এ প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তারা প্রায় অর্ধেক সুদে ঋণ পাবেন।
কোন খাতে কত বরাদ্দ : ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যভিত্তিক তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। এ ছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি এবং উত্তরবঙ্গ কৃষি হাবে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত স্কিমগুলোতে ছোট উদ্যোক্তা ও নতুন কর্মসংস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিটে ৫ হাজার কোটি, চামড়া ও জুতা রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি এবং হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য ১ হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ১ হাজার কোটি, পরিবেশবান্ধব পণ্যে ১ হাজার কোটি, স্টার্টআপে ৫০০ কোটি এবং সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
২৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য : বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এ প্যাকেজের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এর মধ্যে কৃষি ও গ্রামীণ খাতে সবচেয়ে বেশি ৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া সিএমএসএমই খাতে ৫ লাখ, বন্ধ শিল্পকারখানায় ২ লাখ এবং কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে আরও ২ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব, প্রবাসী কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, স্টার্টআপ ও সৃজনশীল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব : বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, এই প্রণোদনা বাস্তবায়িত হলে বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হবে, রপ্তানি আয় বাড়বে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ীদের আস্থাও বাড়বে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ ও বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে শিল্প ও ব্যবসা খাত চাপে রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কিছু বন্ধও হয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বড় আকারের প্রণোদনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তার মতে, এ উদ্যোগ সফল হলে বিনিয়োগ বাড়বে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে।
পড়ুন:দাম কমে দেশে কত টাকায় স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে?
দেখুন:গাজা যু/দ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বেশি অ/স্ত্র দিল ভারত!
ইমি/


