আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক সামাজিক রীতিনীতি বদলে গেলেও, কিশোরগঞ্জে এখনো টিকে আছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এক অনন্য ঐতিহ্য। সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের রঙ্গার কোনা গ্রামে প্রতিবছর ঈদুল আজহায় দেখা মেলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের। গ্রামের আশকর হাজী বাড়ির মসজিদের মাঠে সমবেত হয়ে পশু কুরবানী করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এরপর পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সেই মাংস সমানভাগে বণ্টন করে দেওয়া হয় গ্রামের প্রায় ৫০০ পরিবারের মাঝে। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে শত শত বছর ধরে এই সম্প্রীতির মেলবন্ধন টিকিয়ে রেখেছেন গ্রামবাসীরা।
এক মাঠে কুরবানী, এক সুতোয় গ্রামবাসী ঈদের নামাজের পর থেকেই রঙ্গারকোনা গ্রামের ওই মসজিদের মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। গ্রামের ছোট-বড় সবাই এসে জড়ো হন এখানে। পঞ্চায়েতের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রামের সব কুরবানীর পশু এক মাঠে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই অভিজ্ঞ কসাই ও গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় পশু জবাই এবং চামড়া ছাড়ানোর কাজ চলে।
কুরবানীর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হয় মূল আকর্ষণ মাংস বণ্টন। পঞ্চায়েতের মুরুব্বি ও যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল পুরো কাজের তদারকি করে। গ্রামের ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র পরিবারের আর্থিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন, প্রতিটি ঘর সমানভাবে এই মাংসের অংশ পায়। গ্রামে এমন একটি পরিবারও থাকে না, যার ঘরে ঈদের দিন কুরবানীর মাংস পৌঁছায় না।
স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুইশত বছর আগে গ্রামের পূর্বপুরুষেরা এই নিয়মের সূচনা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে গ্রামের কোনো দরিদ্র মানুষ কুরবানীর আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন এবং সবার মাঝে যেন সমতা বজায় থাকে। যুগের পর যুগ ধরে বংশপরম্পরায় তরুণ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে লালন করে আসছে।
স্থানীয়রা আরো বলেন আমাদের বাপ-দাদারা এই নিয়ম চালু করে গেছেন। আমরাও এটা ধরে রেখেছি এবং আমাদের সন্তানরাও এই ঐতিহ্য বজায় রাখবে। একসাথে সবাই মিলে মাংস ভাগ করার এই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।
আজকের দিনে যখন অনেক জায়গায় ব্যক্তিকেন্দ্রীক ভাবনা প্রকট হচ্ছে, তখন রঙ্গার কোনা গ্রামের এই পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন গ্রামের শৃঙ্খলা বজায় থাকে, অন্যদিকে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ঘরে। সামাজিক সৌহার্দ্য ও সাম্যের এই মেলবন্ধন সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

