যেখানে মানুষ সুস্থ হওয়ার আশায় ছুটে আসে, সেই হাসপাতালই যেন এখন পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির নতুন উৎস। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা ও খাদ্যবর্জ্য দিনের পর দিন খোলা স্থানে ফেলে রাখার কারণে সৃষ্টি হয়েছে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। হাসপাতাল-সংলগ্ন পুকুরপাড়ে জমে থাকা বর্জ্য পচে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে হাসপাতালের কর্মচারী, রোগীর স্বজন এবং আশপাশের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। রোগ সারাতে এসে রোগীর স্বজনরাও নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টার ও মসজিদ-সংলগ্ন পুকুরের পশ্চিম পাশে কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই স্তূপ করে রাখা হয়েছে চিকিৎসা বর্জ্য। ব্যবহৃত চিকিৎসা সামগ্রী, খাদ্যবর্জ্য ও নানা ধরনের আবর্জনা একই স্থানে জমা করা হচ্ছে। এমনকি বর্জ্যের স্তূপে মৃত মুরগিও পড়ে থাকতে দেখা গেছে। অসহনীয় দুর্গন্ধে সেখানে কয়েক মিনিটের বেশি অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শুধু পরিবেশই নয়, দূষিত হচ্ছে পাশের পুকুরের পানিও। কুকুর, কাকসহ বিভিন্ন প্রাণী বর্জ্য টেনে আশপাশে ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্জ্যের স্তূপের একেবারে পাশেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী। পুকুরের পূর্ব পাশে রয়েছে আবাসিক এলাকা ও কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরে মসজিদ এবং দক্ষিণ পাশে বহু পরিবারের বসতি। ফলে এই দূষণের প্রভাব পড়ছে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে।
হাসপাতালের কর্মচারী ও স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা মোকসেদ আলী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে পরিবার নিয়ে দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। বহুবার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। চিকিৎসা বর্জ্য ও আবর্জনায় পুকুরের পানিও দূষিত হয়ে গেছে। এখন সেই পানি স্পর্শ করতেও ভয় লাগে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স মমতাজ বেগম বলেন, “আমরা প্রতিদিন মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত। অথচ নিজের পরিবারকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখতে হচ্ছে। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
পুকুরের দক্ষিণ পাশে বসবাসকারী রবি বলেন, “প্রতিদিন এই আবর্জনার পাশ দিয়ে চলাচল করতে হয়। দুর্গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। পুকুরের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এখন মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রেও ভয় কাজ করে।”
হাসপাতালপাড়া এলাকার বাসিন্দা, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন, “হাসপাতালের বর্জ্যের কারণে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। রোগীর স্বজন, হাসপাতালের কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ সবাই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, পুকুরপাড়ে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব পৌরসভার। তারা নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ না করায় পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পৌরসভাকে ৫৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা পৌর কর পরিশোধ করেছে। তারপরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি জানিয়ে আবারও পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হবে।”
কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক আলহাজ্ব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ বলেন,এ বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পৌর সভাকে জানানো হয়েছে। বজ্র সরিয়ে পুকুর পরিষ্কার করে স্বাভাবিক পরিবেশে আনা খুবই প্রয়োজন।বর্জ্যের কারনে আশপাশের মানুষজন প্রতিদিন বায়ুবাহিত রোগসহ নানান রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন বলে জানান তিনি।
তবে কুড়িগ্রাম পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি এম কুদরত-এ-খুদা বলেন, হাসপাতালের বর্জ্য এমনভাবে ফেলা হয় যে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তা অপসারণ করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়েন। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ও ভাঙা কাচের আঘাতে কর্মীরা আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিরাপদ উপায়ে বর্জ্য সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ নেব।
একদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, অন্যদিকে পৌরসভার দায় চাপানোর প্রবণতা—এই দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চিকিৎসা বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের দাবি, দায় এড়ানোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে চিকিৎসা বর্জ্য অপসারণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হোক। কারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে আর কোনো অবহেলার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মির্জা নাসির উদ্দীন বলেন,বর্জ্য অপসারন করে এটা রিসাইক্লিং করা যেতে পারে।ফলে পরিবেশ দুষন থেকে মানুষ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।


