দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার প্রত্যাশার মধ্যেই আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর নানা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হবে এবারের বাজেটে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর বার্তা দিতে চায় সরকার। অর্থনীতিকে পুনরায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হতে যাচ্ছে এ বাজেটের প্রধান লক্ষ্য।
জানা গেছে, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেবেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো, ভঙ্গুর অর্থনীতির
পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, মানুষের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসাসেবা, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অঞ্চলিভত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরার লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হবে।
দেশের প্রত্যেকটি মানুষের কথা মাথায় রেখে এবারের বাজেট দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের প্রত্যেক নাগরিককে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাউকে বাইরে রাখা হবে না। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এবং জীবনযাত্রার মানের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের তুলনায় বাজেটে সবার সুখ-দুঃখের কথা বিবেচনা করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জনতুষ্টিকে সামনে রেখে আগামী বাজেটের মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা ফিরিয়ে আনা এবং কল্যাণমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা। অন্যদিকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি কল্যাণকর অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যুবসমাজকে দক্ষ করে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে সঠিক প্রকল্প নির্বাচন, বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো জনকল্যাণমুখী খাতগুলো থাকছে এই বাজেটের মূল কেন্দ্রে। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পুনর্গঠন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে আইনি জটিলতা দূরীকরণ এবং চলচ্চিত্র, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মতো সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের বিকাশকে এবার বিশেষভাবে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার।
অন্যদিকে কর প্রস্তাব যেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে চাপে না ফেলে তা বিবেচনা করে বাজেট প্রস্তুত করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে জনগণের ওপর নতুন করের চাপ না দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা সহজীকরণ ও ডিজিটাল রাজস্ব ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। বেশিরভাগ নিত্যপণ্যে কর ছাড় ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা রাখা হয়েছে। ব্যবসা সহজ করা ও সাধারণ মানুষকে শক্তি দেওয়ার ওপর এবারের বাজেটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় আগামী বাজেটে করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বৈষম্য কমাতে ধনীদের আগের চেয়ে বেশি কর দিতে হবে। বর্তমানে একজন করদাতার নিট পরিসম্পদের মূল্যমান চার কোটি টাকা পর্যন্ত সারচার্জ শূন্য। চার কোটি টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করলে সারচার্জের পরিমাণ ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া একাধিক গাড়ি থাকলে সিসিভেদে ২৫ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পরিবেশ সারচার্জ দিতে হয়। আগামী বাজেটে বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে চার কোটি টাকার বেশি তবে ১০ কোটির কম সম্পদ থাকলে তাকে সম্পদমূল্যের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘সম্পদ কর’ দিতে হবে। ১০ কোটির বেশি তবে ২০ কোটির কম হলে এক শতাংশ, ২০ কোটির বেশি কিন্তু ৫০ কোটির কম হলে এক দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৫০ কোটির বেশি হলে দুই শতাংশ ‘সম্পদ কর’ নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এই সম্পদ কর কোনোভাবেই করদাতার প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হবে না।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা, কৃষি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করেছে অর্থবিভাগ। বাজেট পরিকল্পনায় দেশের অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈষম্যহীন দেশ গঠনের অঙ্গীকার এক বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে তারেক রহমান দেশে ফেরার সময় সবচেয়ে বেশি প্রচার পায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান। এই দর্শন স্থান পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বাজেট প্রস্তাবনাতেও। এ জন্য দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ও নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছেন আসছে বাজেটে। কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ নামক নতুন এক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য আসন্ন বাজেটে ২০০ টাকার করার এক বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল আকারের এই বাজেট আগামীকাল ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নকেন্দ্রিক একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তাবিত এই বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের মতে, একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেটের পরিসংখ্যান
আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতির আকার বা জিডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ঘাটতি অর্থায়নের কাঠামো। মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, নতুন বাজেটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থাকা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকার যেসব খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, সেগুলোকে সময়োপযোগী আখ্যা দিলেও বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা ধরে রাখা কঠিন হবে। বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে হলে প্রয়োজনে ঘাটতি বাজেট করে হলেও সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে সুদের হার কমিয়ে আনতে হবে। সুদের হার কমলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে এগিয়ে আসার সাহস পাবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ আমাদের সময়কে বলেন, বিগত দুই বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের বিচার বিভাগ, বিভিন্ন সংস্কার এবং গণতন্ত্র উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে একটি বড় প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়েছে। যেহেতু এটি এই সরকারের প্রথম বাজেট, তাই তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এখানে থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে এবার বাজেটের আকার ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে জনতুষ্টির কথা মাথায় রেখে সরকারের হাতে আসলে এর কোনো বিকল্পও নেই। তবে এই বিশাল বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন যদি সরকার পরিকল্পনা মাফিক সফলভাবে করতে পারে, তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির’ যে স্বপ্ন সরকার দেখছে, তা বাস্তবায়ন করা পুরোপুরি সম্ভব।
পড়ুন:জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হচ্ছে আজ
দেখুন:‘দুর্নীতির কারণে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ে
ইমি/


