বিজ্ঞাপন

প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, চর পেরিয়ে হাসপাতালের পথে মৃত্যু

মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর চার পুত্র সন্তানের পর ঘরে এসেছিল একটি মেয়ে শিশু। নতুন অতিথিকে ঘিরে পরিবারজুড়ে ছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে জীবন বাঁচাতে শুরু হয় ছুটে চলা। চর পেরিয়ে নৌকা, তারপর অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় এক মায়ের জীবনপ্রদীপ।

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনার চর গ্রামের বাসিন্দা এবং ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য আফরোজা বেগম (৩৮) শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টার দিকে নিজ বাড়িতে তিনি পঞ্চম সন্তানের জন্ম দেন। চার ছেলে সন্তানের পর এবারের নবজাতকটি ছিল কন্যা। প্রসবের কিছুক্ষণ পরই তাঁর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে স্বজনরা তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু চরাঞ্চলে কোনো হাসপাতাল বা জরুরি চিকিৎসাসেবা না থাকায় প্রথমে নৌকাযোগে নদী পাড়ি দিয়ে মূল ভূখণ্ডে আসতে হয়। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। তবে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।

স্থানীয়দের মতে, সময়মতো চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলে হয়তো একটি প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য নিকটবর্তী হাসপাতাল ও জরুরি মাতৃসেবা না থাকায় এমন ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বহন করতে হয় বলে তারা অভিযোগ করেন।

আফরোজা বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম, তিন ছেলে এবং নবজাতক কন্যা রয়েছে। তবে এক বছর আগে তাঁদের বড় ছেলে মারা যায়। সেই শোকের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই পরিবারটিকে আরও বড় এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হলো। জন্মের দিনই নবজাতক কন্যাটি হারাল তার মায়ের স্নেহ, আর দুই সন্তান হারাল তাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

স্থানীয়রা জানায়, পাঁচ বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আফরোজা বেগম। এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক বিভিন্ন কাজে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে কালাসোনার চরসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। স্ত্রীকে হারিয়ে স্বামী রফিকুল ইসলাম কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্তানদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, আফরোজা বেগম ছিলেন মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। যেকোনো সমস্যা নিয়ে মানুষ তাঁর কাছে গেলে তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করতেন। তাঁর মৃত্যুতে উড়িয়া ইউনিয়ন একজন জনপ্রিয় ও মানবিক জনপ্রতিনিধিকে হারালো।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, আফরোজা বেগম মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন। এলাকার যেকোনো সমস্যায় তিনি সবার আগে এগিয়ে আসতেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন সহকর্মীই নয়, একজন মানবিক ও পরোপকারী মানুষকে হারালাম।

উড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, আফরোজা বেগম ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সৎ ও জনবান্ধব একজন জনপ্রতিনিধি। ইউনিয়নের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে তিনি সবসময় আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে উড়িয়া ইউনিয়ন একজন নিবেদিতপ্রাণ জনপ্রতিনিধিকে হারালো। এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

পড়ুন: ড্র নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু ব্রাজিলের

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন