১০০ দিনের বেশি সময় ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে একটি সমঝোতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু যুদ্ধের শেষে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অনেকের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে সংঘাতের শুরু হলেও ইরান বরং আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে পৌঁছেছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ্যে এনেছে। ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের আধিপত্য নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিগত সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত। অন্তত এখন পর্যন্ত এমনটাই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ এই যুদ্ধের ফলে শত্রুদের দমন করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে স্থিতিশীলতার দ্বীপ হিসেবে পরিচিত তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ব্যবসায়িক ও কৌশলগত অবস্থান আগের অবস্থায় ফিরতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত আলোচনায় এসব দেশের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে জোটগত নির্ভরতা বৈচিত্র্যময় করার কথা বলছেন। একই সঙ্গে উপসাগরের ওপারে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন পথ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনা করছেন তারা।
চীনও নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন অস্ত্রভাণ্ডার ব্যবহার করতে হয়েছে, যা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের শক্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে গেছে। যদি শেষ মুহূর্তে কোনও জটিলতা না দেখা দেয়, তাহলে এই সমঝোতা এমন একটি যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে, যার ভিত্তি ছিল তেহরানের শক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভুল মূল্যায়ন।
যুদ্ধের কারণে যাদের জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে, বিশেষ করে সরাসরি হামলার মুখে থাকা বেসামরিক মানুষের জন্যও এটি স্বস্তির বড় কারণ হবে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যাবে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
টানা কয়েক মাসের এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল সার সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বছরের শেষ দিকে দরিদ্র দেশগুলোর মানুষ খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিবিসি বলছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সমঝোতা কোনও পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি নয়। দুই পৃষ্ঠার ১৪ দফার যে সমঝোতা স্মারকের কথা আলোচকরা বলেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের বন্দরের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে।
আর সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেয়া হয়েছে। সেসব আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং বিনিময়ে কী পরিমাণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, এই সমঝোতার মাধ্যমে তার সমাপ্তির পথে অবশেষে একটি দাগ টানা হলো।
এখন সময়কে ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ফিরিয়ে নেয়া যাক। সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনী ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যুদ্ধবিমানগুলো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হচ্ছিল, ক্রুদের ব্রিফিং দেয়া হচ্ছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে, সেটিও নির্ধারণ করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে একই সময়ে জেনেভায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ইরানি আলোচকরা বিশ্বাস করতেন যে তারা একটি বাস্তবসম্মত ও গুরুত্ববহ আলোচনার মধ্যে রয়েছেন। তারা নিজেদের দাবি ছাড়াও কিছু ছাড় দেয়ার প্রস্তাবও টেবিলে রেখেছিলেন।
সে সময় হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কৃষি সার ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমান সমঝোতা স্মারক পারমাণবিক আলোচকদের আবার আলোচনায় ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে এবং জাহাজ চলাচলের পথও খুলে দিচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর ২৪ ঘণ্টা আগে যে অবস্থান ছিল, পরিস্থিতি আবার অনেকটা সেখানেই ফিরে যাচ্ছে।
বিবিসি বলছে, ধ্বংসাত্মক একাধিক আকস্মিক হামলার প্রথম ধাপেই ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের হত্যা করে। প্রায় একই সময়ে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে মার্কিন হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। একাধিক তদন্তে এমন দাবি করা হয়েছে।
এতে ১৫০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিল ১২ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থী, যাদের বেশিরভাগই মেয়ে। ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন।
তাদের ধারণা ছিল, যুদ্ধ হবে স্বল্পমেয়াদি, দ্রুত এবং বিজয়ের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু সেই হিসাব বড় ধরনের ভুল প্রমাণিত হয়। তাদের বক্তব্যে তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে টিকে থাকার পাশাপাশি ইরানের শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
মূলত ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে আশঙ্কা তেহরান দীর্ঘদিন ধরে করে আসছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত সেই পথেই এগোয়। তবে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ফলে দীর্ঘ সংঘাতে টিকে থাকার পাশাপাশি ইরানের নেতৃত্ব আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।
খামেনি ও তার উপদেষ্টারা মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হলেও দ্রুতই সেই ধাক্কা ইরান কাটিয়ে ওঠে এবং নতুন ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া হয়। আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি পশ্চিম এশিয়ার এই দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হন। পাশাপাশি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জ্যেষ্ঠ নেতাদের নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের কমান্ডাররা সামনে আসেন।
তারা আগের নেতৃত্বের মতোই আদর্শিক অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন, তবে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তাদের বিশ্বাস ছিল, এটি ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সুপরিকল্পিত কৌশল বাস্তবায়ন করেন এবং ইরানের আরব প্রতিবেশী, মার্কিন ঘাঁটি ও বাহিনী এবং ইসরায়েলের ওপরও হামলা চালায়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই দাবি অতিরঞ্জিত ও ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
যুদ্ধে ইসরায়েল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অংশীদার। তবে সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং এই চুক্তি নিয়ে তেল আবিবে হতাশা দেখা দিয়েছে।
নেতানিয়াহু চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, ইরানকে ধ্বংস করার সুযোগের অপেক্ষায় তিনি পুরো রাজনৈতিক জীবন অপেক্ষা করেছেন। তার কাছে ইরানই ইসরায়েলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু।
এখন উল্টো তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন। চলতি বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে এই সমালোচনা ও রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হবে।
সমঝোতার পথে একটি বড় বাধা হতে পারে দক্ষিণ লেবাননে দখল না ছেড়ে ইসরায়েলের অবস্থান। সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার ভবন ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় দখল করা অঞ্চলগুলোতে তারা ‘অনির্দিষ্টকাল’ অবস্থান করবেন।
এছাড়া লেবাননে আরও সামরিক পদক্ষেপ নিতে নেতানিয়াহুর ওপর কট্টরপন্থি মন্ত্রী ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপ রয়েছে। কেউ কেউ তো আবার দক্ষিণ লেবাননকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার দাবিও তুলছেন।
এ অবস্থায় ট্রাম্পকে অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি নেতানিয়াহু নেবেন কি না, তা তাকে বিবেচনা করতে হবে। সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সর্বশেষ গত রোববার বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে ইসরায়েলের বিমান হামলাকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আলোচনা ভণ্ডুল করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি আলোচনাকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হচ্ছে।
সামনে কী?
এখন অন্তত কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের ঐতিহাসিক সমঝোতায় রূপ নেবে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি।
অবশ্য এ ধরনের কোনও চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র বদলে দিতে পারে। কিন্তু আদর্শিক বিরোধ এবং পারস্পরিক আস্থার চরম ঘাটতি সেই সম্ভাবনাকে এখনও অনেক দূরের স্বপ্ন করে রেখেছে।
এছাড়া এই পুরো পরিস্থিতি সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই হতাশাজনক ছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির অধিকারী। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার ট্রাম্পের হঠাৎ সিদ্ধান্ত এখন এমন এক পরাশক্তির পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, যে পরিবর্তনশীল বিশ্বে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

