নেত্রকোনার কাইলাটি ইউনিয়নকে ‘সবুজ ও পরিবেশবান্ধব’ মডেল হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী জনসংলাপ। বুধবার (১৭ জুন) বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক; এবং ‘গ্রিন কোয়ালিশন কমিটি’র যৌথ উদ্যোগে কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে স্থানীয় পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার এই তাগিদ দেওয়া হয়।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল হক। অনুষ্ঠানে স্থানীয় ইউপি সদস্য, কৃষক, যুবক, কিশোরী, শিক্ষক, উন্নয়ন কর্মী এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ইউনিয়নের বর্তমান পরিবেশগত সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।
উন্মুক্ত সংলাপে বক্তারা কাইলাটি ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মগড়া নদী ও ফচিকা খালের বর্তমান করুণ অবস্থা তুলে ধরেন। পাশাপাশি, শতবর্ষী গাছ কর্তন, অবাধে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার, ক্রমবর্ধমান জলাবদ্ধতা এবং শত বছরের পুরোনো পুকুরগুলোর নাজুক দশার কথা গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়।
কৃষক প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, অবাধে খাল-বিল ভরাট, নিষিদ্ধ কীটনাশকের অতিব্যবহার এবং দূষণের কারণে ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির উৎস মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। এর ফলে সরাসরি হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য সম্পদ। ভয়ংকর ‘চায়না দুয়ারি জাল’ এর ব্যবহার নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। এই জালের কারণে ছোট মাছ, ডিম, পোনামাছ, শামুক, ঝিনুক, বিভিন্ন জলজপ্রাণ, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং জলজ উদ্ভিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবি, প্রস্তাবনা ও কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে বেদখল হওয়া জলাশয়গুলো উদ্ধার ও পুনঃখননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণ ও যুব সম্প্রদায়ের আহ্বান, ফসলি জমির টপসয়েল (উপরিভাগের উর্বর মাটি) কাটা ও নির্বিচারে মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। একইসাথে এলাকার ঐতিহ্যের স্মারক শতবর্ষী গাছগুলো টিকিয়ে রাখা এবং বন উজাড় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কিশোরী ও উন্নয়ন কর্মীদের শঙ্কা, বনাঞ্চল কমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় বন্যপ্রাণী ও পাখিরা আজ আবাসন হারিয়ে বিলুপ্তির পথে। জীববৈচিত্র্যের এই ভারসাম্যহীনতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল হুমকি।
শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের মত, পরিবেশ রক্ষা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ইউনিয়ন পরিষদকে পরিবেশ আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি গ্রামে ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে কাইলাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল হক সংলাপে উঠে আসা প্রতিটি যৌক্তিক দাবি ও মতামতকে স্বাগত জানান। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আমাদের নদী, খাল, মাটি আর জীববৈচিত্র্য বাঁচানো কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়। ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। শতবর্ষী গাছ রক্ষা এবং সামাজিক বনায়ন বাড়াতে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
সংলাপের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সকলেই কাইলাটি ইউনিয়নকে দূষণমুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও ‘সবুজ ইউনিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে একাত্মতা প্রকাশ করেন। পরিবেশ ধ্বংসের যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে এবং গৃহিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে ‘পরিবেশ নজরদারি কমিটি’ গঠনের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়।
পড়ুন : টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবে আন্তঃক্লাব ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন


