ফুটবল বিশ্বকাপের জ্বরে কাপছে গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশের শহর-গ্রামেও ছড়িয়েছে মেসি-নেইমার-রোনালদোর ফুটবল উন্মাদনা। প্রিয় দলের জার্সি পতাকা শোভা পাচ্ছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ভবনের ছাদে৷ তবে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহে। টাকার অভাবে পছন্দের দলের আসল পতাকা কিনতে না পেরে পলিথিন দিয়ে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়ে উড়িয়েছে ঝিনাইদহের শিশু আবির হোসেন (১১)।
আবির হোসেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ভুটিয়ারগাতী গ্রামের আলিউল ইসলামের ছেলে ও উজির আলী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র।
জানা গেছে, বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা শুরু হওয়ার পরে স্কুলছাত্র আবিরের প্রতিবেশী, বন্ধু ও সহপাঠীরা তাদের প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনে বাড়িতে টানায়। তবে আর্থিক সংগতি না থাকায় আবির পতাকা ও জার্সি কিনতে পারেনি। পরে সে বাড়ির পাশে পড়ে থাকা পলিথিন সুতা দিয়ে সেলাই করে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে নিজ হাতে পতাকা বানায়। সেই পতাকা শিশু আবীর তার বাড়ির সামনে টানিয়ে রাখে।
বিষয়টি স্থানীয় এক আর্জেন্টিনা সমর্থক দেখে ঝিনাইদহের আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাবের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে জানায়৷ পরে বুধবার বিকালের আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন, জিকু হাসান, শাহজাহান নবীন ও সামিউল হক সামি সহ ক্লাবের কয়েকজন সদস্য শিশু আবীরের বাড়িতে উপস্থিত হন।
এসময় আবিরের তৈরি পলিথিনের পতাকা নামিয়ে তাকে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের পক্ষ থেকে একটি আসল পতাকা, ফুটবল ও জার্সি উপহার দেয়া হয়। আসল জার্সি, পতাকা ও ফুটবল পেয়ে খুশিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শিশু আবীর। এসময় উপস্থিত সকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শিশু আবিরের প্রতিবেশীরা জানান, বিশ্বকাপ ফুটবল গ্রামে বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা নিজ নিজ দলের পতাকা উড়িয়েছে। আবির আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির সমর্থক। পড়াশোনায় মনোযোগী আবির খেলাধুলায়ও পারদর্শী। তবে টাকার অভাবে সে আসল পতাকা কিনতে না পেরে পলিথিন দিয়ে আর্জেন্টিনার পতাকা বানিয়েছে। সেই পতাকা বাঁশের কুঁঞ্চিতে বেঁধে বাড়ির উঠোনে টানিয়ে রাখে আবির।
জানা গেছে, শিশু আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম শহরের একটি গ্রিল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অভাব-অনটনের মাঝে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে আলিউল ইসলামের সংসার৷ তাই ছেলের আবদার তিনি মেটাতে পারেননি।
আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম বলেন, বিশ্বকাপ শুরুর পর থেকে আমার ছেলের একটা জার্সি আর পতাকার জন্য বায়না করে। কিন্তু আমরা গরিব মানুষ, সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়। তাই, পতাকা ও জার্সি কেনা পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার ছেলে পড়াশোনায় ও খেলাধুলায় খুব আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, আজ শহরের কয়েকজন ভাই এসে আমার ছেলেকে আর্জিন্টিনার জার্সি, ফুটবল ও পতাকা দিয়ে গেছে। আমার ছেলেটা খুব খুশি। সারারাত জার্সি পরে, ফুটবল বিছানায় নিয়ে ঘুমিয়েছে। আমার ছেলের খুশিতে আমার পরিবারের সবাই খুশি। যারা আমার সন্তানের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, তাদের জন্য অনেক দোয়া করি।
স্থানীয় খালিদ হাসান জীবন বলেন, ‘আবির একটি পতাকা কিনতে না পেরে নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছে। এ কথা শুনে বিষয়টি আমি মঙ্গলবার রাতে আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের সদস্যদের জানাই। পরদিন বুধবার বিকালে তারা আবিরের বাড়িতে এসে উপহারগুলো পৌছে দেন।’
নতুন জার্সি ও পতাকা পেয়ে কান্নাজড়িত কন্ঠে আবির বলে, আমি মেসির ভক্ত৷ মেসির খেলা আমার খুব ভালো লাগে। মেসির খেলা দেখেই আমি আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক। আব্বুকে বলেছিলাম, মেসির ১০ নস্বর জার্সি কিনে দিতে, একটা আর্জেন্টিনার পতাকা কিনে দিতে। কিন্তু টাকা নেই বলে আব্বু কিনে দিতে পারেনি। তাই, বাড়ির পাশে ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকা পলিথিন দিয়ে আর্জের্টিনার পতাকা বানিয়ে উঠানে উড়িয়ে দেই।
আবির আরও বলে, ‘আমি নতুন জার্সি, ফুটবল ও পতাকা পেয়েছি৷ কয়েকজন আঙ্কেল ও ভাই আমাকে উপহারগুলো দিয়েছেন। আমি খুব খুশি। আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বকাপ জিতবে ইনশাআল্লাহ। মেসিই কাপ পাবে।’ এসব কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আবির।
আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহজাহান নবীন বলেন, ‘শিশুটির ফুটবলের প্রতি যে আবেগ, তা আমাদের অবাক করেছে। খবরটি পাওয়া মাত্রই আমরা আমাদের সাধ্য মতো আবিরের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করেছি। কেবল ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সূদুর আর্জেন্টিনা ও মেসির প্রতি তার যে সমর্থন ও ভালোবাসা দেখিয়েছে তা আমাদের মুগ্ধ করেছে। মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল গেমসের আগ্রাসনের এই যুগে আবিরের মতো শিশুরাই সুন্দর আগামীর দৃষ্টান্ত।
ক্লাবের অ্যাডমিন শাহীনুর রহমান লিটন বলেন, ‘ছোট্ট শিশুটির ভালোবাসা ও আবেগ আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সেই ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা ওর জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম। ওর হাসিমুখ দেখে আমরাও আমাদের আবেগ ধরে রাখতে পারিনি।’
পড়ুন : সুবর্ণচরে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রান্তিক চাষীদের প্রশিক্ষণ


