প্রথম ম্যাচে পুঁচকে ক্যাপ ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্রয়ের হতাশা ভুলে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজ রূপে ফিরল স্পেন। গ্রুপ ‘এইচ’তে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে আজ আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে সৌদি আরবের রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে ৪-০ ব্যবধানে হারাল স্প্যানিশরা। তাতেই পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছে তারা।
প্রথম ম্যাচে নবাগত ক্যাপ ভার্দের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ২ পয়েন্ট হারিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল স্পেন। আজ যেন সেই ক্ষোভটাই সৌদি আরবের ওপর উগরে দিল তারা। ম্যাচের শুরু থেকেই চেনা টিকিটাকা আর আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসে ২০১০ সালের বিশ্ব বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। হামস্ট্রিং ইনজুরি কাটিয়ে আজ শুরুর একাদশে ফিরেই স্পেনের আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দেন তরুণ বিস্ময় বালক লামিনে ইয়ামাল।
ম্যাচের দশম মিনিটে মিকেল ওয়ারজাবালের ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক ফিনিশিংয়ে স্পেনকে প্রথম লিড এনে দেন ইয়ামাল। প্রথম গোলের ধাক্কা সৌদি আরব সামলে ওঠার আগেই শুরু হয় ওয়ারজাবাল ঝড়। ম্যাচের ২১ এবং ২৪ মিনিটে মাত্র ৩ মিনিটের ব্যবধানে পর পর দুটি চোখধাঁধানো গোল করে দলের বড় জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন রিয়াল সোসিয়েদাদের এই ফরোয়ার্ড। প্রথমার্ধেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে ম্যাচ পুরোপুরি নিজেদের পকেটে পুরে নেয় স্পেন।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে (৪৯ মিনিটে) স্প্যানিশ ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়ার জোরালো শট ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে দেন সৌদি ডিফেন্ডার হাসান আল-তামবাক্তি। এই আত্মঘাতী গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৪-০।
এরপর বেশ কিছুক্ষণ নিজেদের জাল অক্ষত রাখে সৌদি আরব। তবে যোগ করা সময়ে আর একটি গোল করেছিল স্পেন। কিন্তু ভিএআরের মাধ্যমে সেই গোলটি বাতি করেন রেফারি। ফলে ৪-০ ব্যবধানে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে স্প্যানিশরা।
২ ম্যাচে সর্বোচ্চ ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের এক নম্বরে অবস্থান স্পেনের। গ্রুপের অন্য তিন দলের পয়েন্ট সমান ১।
মাঠে স্পেনের যে দাপট, তাতে সৌদি সমর্থকদের মনে পুরনো এক দুঃস্বপ্ন উঁকি দিতে বাধ্য। ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে সেই বিখ্যাত ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতি আজও ভোলেনি আরব ফুটবল। আজ আটলান্টার মাঠে স্প্যানিশরা যেভাবে খেলছে এবং প্রথমার্ধেই যেভাবে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছে সৌদি আরব, তাতে প্রশ্নটা উঠেই যাচ্ছে—২০০২ সালের পর বিশ্বকাপে এটিই কি হতে যাচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় পরাজয়? খেলা যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে ব্যবধান আরও বাড়লে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না!
আটলান্টায় সৌদি আরবকে চেপে ধরেছে ‘লা রোজা’রা। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি স্পেনের হাতে, স্কোরলাইন এখন ৩-০! অবিশ্বাস্য শুরু স্পেনের! ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের গোলবন্যা যেন থামছেই না। মাঠের এক প্রান্ত থেকে উড়ে আসা একটিাকোণাকুণি (ডায়াগনাল) ক্রস দারুণ দক্ষতায় বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নেন মার্ক কুকুরেয়া। সেখান থেকে দানি ওলমো মাথা ছুঁইয়ে বল বাড়িয়ে দেন সামনে। আর বল পেয়েই নিখুঁত শটে জালে জড়াতে একদম ভুল করেননি মিকেল ওয়াইরসাবাল।
অল্প সময়ের ব্যবধানে এটি ওয়াইরসাবালের দ্বিতীয় গোল! সৌদি আরব কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্কোরলাইন ৩-০ করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নিল স্পেন।
একটি কর্নার কিক থেকে জটলার সৃষ্টি হয়েছিল। বল পেয়ে যান দানি ওলমো, তিনি দারুণ এক ফ্লিকে বল বাড়িয়ে দেন সিক্স-ইয়ার্ড বক্সের দিকে। সৌদি ডিফেন্ডাররা বলটি ক্লিয়ার করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হলে সুযোগসন্ধানী এমেরিক লাপোর্ত মাথা ছুঁইয়ে বলের দিক বদলে দেন। একদম ফাঁকায় বল পেয়ে যান মিকেল ওয়াইরসাবাল। সৌদি রক্ষণভাগকে ফাঁকি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে জড়াতে কোনো ভুল করেননি তিনি। ডান কোণ দিয়ে বল জড়াল জালে। ২-০ গোলে এগিয়ে স্পেন!
মাঠে স্পেনের একক আধিপত্য চলছেই। শুরুর একাদশে লামিনে ইয়ামালকে রাখার সুফল হাতেনাতে পাচ্ছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। বার্সেলোনা তারকা আজ শুধু গোলই করেননি, নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৮ বছর বা তার কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ম্যাচের প্রথম গোল করার কীর্তি ছিল এত দিন মাত্র একজনের। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ওয়েলসের বিপক্ষে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের হয়ে ডেডলক ভেঙেছিলেন মহানায়ক পেলে। দীর্ঘ ৬৮ বছর পর পেলের সেই অনন্য রেকর্ডে ভাগ বসালেন ১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল।
খেলা শুরুর ১০ মিনিটেই জাদু দেখালেন লামিনে ইয়ামাল! বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের প্রথম শুরুটা রাঙাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় নিলেন বার্সেলোনা তারকা। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়েই বাজিমাত! দুর্দান্ত এক গোলে স্পেনকে শুরুতেই এগিয়ে নিলেন এই তরুণ তুর্কি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের প্রথম গোলের দেখা পেয়ে গেলেন ইয়ামাল। স্প্যানিশ ফুটবলের নতুন রাজপুত্রের শুরুটা হলো রাজকীয়ভাবেই।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্রয়ের পর চাপেই আছে স্পেন। আজ সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁরা প্রথম একাদশে রেখেছে লামিনে ইয়ামালকে। আগের ম্যাচে ৭১ মিনিটের সময় বদলি হিসেবে নেমেছিলেন তিনি। ইয়ামাল ছাড়াও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুর একাদশে আরও তিনটি পরিবর্তন এনেছে স্পেন। সৌদির বিপক্ষে তাদের ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত দশটায়।
গড়ে ২৮ বছর ২৭২ দিন বয়সী এক একাদশ নিয়ে আজ মাঠে নামছে সৌদি আরব। বিশ্বকাপে এটি তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী শুরুর একাদশ। এর চেয়ে বেশি বয়সী একাদশ নিয়ে তারা খেলেছিল কেবল ২০১৮ বিশ্বকাপে, স্বাগতিক রাশিয়ার বিপক্ষে (২৯ বছর ১৯৭ দিন)। সৌদি ফুটবলপ্রেমীরা অবশ্য সেই ম্যাচের স্মৃতি মনে রাখতে চাইবেন না, সেবার স্বাগতিকদের কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল তাদের।


