ভেনেজুয়েলায় পরপর আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৫ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৪,৩০০ জনেরও বেশি। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উত্তর উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চলে।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, বহু মানুষ এখনও ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সড়ক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
আর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন দুইশ’র মতো মানুষ। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১১ হাজার। উদ্ধার তৎপরতায় মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ।
গত বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এটাকে গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর অন্যতম বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রথমে প্রচণ্ড কম্পন, এরপর চারদিকে ধস আর আতঙ্ক। মুহূর্তের মধ্যেই থমকে গেছে ভেনেজুয়েলার স্বাভাবিক জীবন। পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা। লাখো মানুষকে ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার মুখে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে বহু মানুষের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। বাড়ছে আহতের সংখ্যাও। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আটকে আছেন অনেকে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে উপকূলীয় লা গুয়াইরা ও রাজধানীর আশপাশের এলাকায়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অনেক স্থানে। ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহও।
বিরোধী দলের তৈরি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য জমা পড়েছে। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস। একই সঙ্গে এই দুর্যোগের প্রভাব দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষদের বাঁচানোর লড়াইয়ে যুক্ত হচ্ছে একের পর এক দেশ। কারাকাসের জন্য দ্রুত ও কার্যকর সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে ভার্জিনিয়া ও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে উপগ্রহচিত্র ও আকাশপথের তথ্যও সরবরাহ করছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধার করা। তবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে ভেনেজুয়েলা ঘুরে দাঁড়াবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, কাতার, ইতালি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, ইরান, তুরস্ক, ইউক্রেন ও রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমবেদনা ও সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বিশেষ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
পোপ লিও চতুর্দশ জরুরি ত্রাণ সহায়তা হিসেবে এক লাখ ইউরো অনুদান দিয়েছেন। প্রায় ২০ লাখ ইউরো সহায়তা দিয়েছে নেদারল্যান্ডসও। ভেনেজুয়েলার এই মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বৈশ্বিক সহযোগিতার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার।
পড়ুন : ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে


