নাম তোসিফ, বয়স মাত্র ৬ বছর। আধো-আধো গলায় নিজের নামটা, বাবার নাম ‘শরীফ’ আর মায়ের নাম ‘লাইজু’ স্পষ্ট করে বলতে পারে সে। বলতে পারে বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায়। কিন্তু নিজের চেনা ঘরের বারান্দায় ফেরার পথটুকু জানে না অবুঝ এই শিশুটি। একবিংশ শতাব্দীর ব্যস্ত নগরী ঢাকায় হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খোঁজে কোনো মা-বাবা এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত ঠিকানা বদলে তোসিফের জায়গা হয়েছে মিরপুরের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে।
রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা, থানায় আশ্রয়___
খিলক্ষেত থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২৪ জুন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে খিলক্ষেত এলাকার একটি রাস্তায় শিশুটিকে একা, ভয়ার্ত চোখে ঘুরে বেড়াতে দেখেন এক পথচারী। চোখে-মুখে আপনজন হারানোর বোবা আকুলতা। মানবিক ওই পথচারী তাকে উদ্ধার করে খিলক্ষেত থানায় নিয়ে আসেন।
থানার নারী ও শিশু ডেস্কে দায়িত্বরত অফিসাররা তাকে বিশেষ মমতায় রাখেন। খিলক্ষেত থানার ফাইলের স্তূপে রাখা ব্রাউন খামের ওপর পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা তোসিফের ছবি দেখলে যেকোনো মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। সে জানে না, নিষ্পাপ ঘুমের আড়ালে লুকিয়ে আছে কতটা কঠিন বাস্তবতা।
শিশুটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—নাম তোসিফ, বাবা শরীফ, মা লাইজু, বাড়ি নোয়াখালী হাতিয়া। কিন্তু কীভাবে হাতিয়া থেকে খিলক্ষেতে এলো, কার সঙ্গে এলো, কিছুই বলতে পারছে না।
পুলিশ-সাংবাদিকের যৌথ মানবিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ___
পরিবার খুঁজে বের করতে খিলক্ষেত থানা তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবালের সঙ্গে। তোসিফের ছবিসহ সহায়তা চাওয়া হয়। জাহিদ ইকবাল আন্তরিকতার সঙ্গে ছবি ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধার গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করেন।
মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের কাছে। অনেকে শেয়ার করে সহমর্মিতা জানান। কিন্তু দিন গড়িয়ে রাত নামলেও কোনো ফোন আসেনি থানায়। খিলক্ষেত-নিকুঞ্জের কোনো পরিবার দাবি করেনি শিশুটিকে। নোয়াখালী হাতিয়া থেকেও কোনো সূত্র মেলেনি। ডিএমপি কন্ট্রোল রুম থেকে দেশের সব থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়, খিলক্ষেত থানার ফেসবুক পেজেও ছবিসহ তথ্য আপডেট দেওয়া হয়। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
শেষ আশ্রয় মিরপুরে____
থানায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কোনো স্বজন না আসায় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিশুটির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও লালন-পালনের স্বার্থে ২৫ জুন তাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন মিরপুরের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। পুলিশের চেনা কোল ছেড়ে অচেনা পরিবেশে পা রাখে তোসিফ।
খিলক্ষেত থানা পুলিশ বলছে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তবু এক বুক একাকীত্ব আর অজানা আতঙ্ক নিয়ে শিশুটির ঠিকানা এখন আশ্রয়কেন্দ্রের চার দেয়াল।
আমাদের মানবিক দায়িত্ব___
আমরা এখনো আশা হারাইনি। আপনার একটি শেয়ার, একটি ফোনকল হয়তো হাতিয়ার কোনো মা-বাবার চোখে পড়বে। ফিরিয়ে দিতে পারে তোসিফের মুখের চেনা হাসি, মায়ের বুকে তার প্রাণের টুকরো।
কেউ শিশুটিকে চিনে থাকলে বা তার পরিবারের খোঁজ জানলে দ্রুত যোগাযোগ করুন: __
খিলক্ষেত থানা: ০১৭৪৩ ২৫২৬৭৯
সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র,_ মিরপুর: ০১৭১ ০৩৪২৬৮
আসুন, মানবিকতার টানে এক হই। যেন তোসিফ আর বেশিদিন অচেনা আশ্রয়ে না থাকে, দ্রুত ফিরে যায় নিজের মায়ের কোলে, নিজের নীড়ে।
পড়ুন : অচেনা শহরে হারিয়ে যাওয়া তোসিফ, খুঁজে ফিরছে আপন ঠিকানা


