ভেনেজুয়েলায় ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপ থেকে গত দুই দিনে ৯২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৩ হাজার ৩৬০ জনকে। তবে এখনও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। রাজধানী কারাকাস, উপকূলীয় শহর লা গুয়াইরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
শুক্রবার ভেনেজুয়েলার পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট (স্পিকার) জর্জ রদ্রিগুয়েজ এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে। ফলে নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিবৃতিতে জর্জ রদ্রিগুয়েজ বলেন, “এমন বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর প্রতিটি জীবন বাঁচানো এক একটি অলৌকিক ঘটনা।”
গত ২৪ জুন বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, দুটি ভূমিকম্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড।
বুধবারের এই জোড়া ভূমিকম্পকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ, বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে দেশটির অসংখ্য ভবন ও বাসাবাড়ি আংশিক কিংবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। ইউএসজিএসের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা এক লাখও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর উত্তর ভেনেজুয়েলার হাজার হাজার পরিবার ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া স্বজনদের উদ্ধারের অপেক্ষায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদেরই একজন নাজারেথ জিমেনেজ।
রাজধানী কারাকাসের উত্তরে লা গুয়াইরায় একটি ধসে পড়া আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপে প্রতিবেশীরা পাওয়ার টুল দিয়ে কংক্রিট কাটার চেষ্টা করছিলেন। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে এক প্রিয়জনের কাঁধে মুখ লুকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজারেথ। বিড়বিড় করে তিনি বলেন, “হায় ঈশ্বর, আমরা ওদের ওখান থেকে কীভাবে বের করে আনব?”
এএফপিকে নাজারেথ জানান, ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা তার ভাইবোন, ভাইপো-ভাইঝি, ভাগ্নে-ভাগ্নি ও বন্ধুদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, সেই উদ্বেগেই তিনি দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারী যন্ত্রপাতির সংকটের কারণে উদ্ধার তৎপরতা প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
বিশ্ববাসীর প্রতি সহায়তার আহ্বান জানিয়ে নাজারেথ এএফপিকে বলেন, “আমরা সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করছি। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে এখনও মানুষ বেঁচে আছে।”
লা গুয়াইরার বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী জেনিফার পালাসিওস জানান, তার ছয় বছর বয়সী ছেলে এবং পরিবারের আরও পাঁচ সদস্য একটি আটতলা আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন। এখনও তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “স্থানীয় লোকজন হাতের কাছে যা পাচ্ছেন, সেসব দিয়েই উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। কিন্তু বিশাল আকৃতির কংক্রিটের চাঁই সরাতে ক্রেন দরকার। আমাদের এখানে এখনও কোনো ক্রেন আসেনি। আশপাশের ভবনগুলোতেও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন।”
এদিকে এএফপির সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তরা কথা বলার সময়ই হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে বিবৃতি দেন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ। তিনি জানান, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় অনুসন্ধান, উদ্ধার এবং ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে দেলসি রদ্রিগুয়েজ বলেন, “নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে, কারণ এখনও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। আমাদের যেসব বিদেশি বন্ধু উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ইচ্ছুক, আমরা তাদের সবাইকে স্বাগত জানাব। এই মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপের তলায় চাপা পড়াদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।”
পড়ুন: যে তিন দেশের নাগরিকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করল সৌদি আরব
আর/


