হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কয়েক দিনের সামরিক উত্তেজনার পর আপাতত সংঘাত এড়িয়ে আলোচনার পথে হাঁটতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রোববার গভীর রাতে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত উভয় পক্ষ সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সম্মত হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান।
আরেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দোহার বৈঠকে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হবে। তবে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার প্রধান বিষয় হবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা।
সপ্তাহজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে দুই দেশের মধ্যে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া নতুন করে চাপে পড়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান হামলা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্র আরও সামরিক পদক্ষেপ নেবে। অন্যদিকে ইরানও জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হলে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হবে।
আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৪৮টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে ২৩টি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার, সাতটি বাল্ক ক্যারিয়ার এবং ১৯টি কার্গো ও কনটেইনারবাহী জাহাজ ছিল। মেরিন ট্রাফিকের তথ্য বলছে, সর্বশেষ উত্তেজনা শুরুর আগে বুধবার ৭০টি এবং বৃহস্পতিবার ৫৪টি জাহাজ ওই প্রণালি অতিক্রম করেছিল, ফলে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচল কমেছে।
রয়টার্সও এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, দুই দেশ আপাতত সামরিক তৎপরতা স্থগিত রেখে আলোচনায় ফিরে যেতে সম্মত হয়েছে। মঙ্গলবার দোহায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন দিক নিয়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা হবে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি দলের প্রধান নিক স্টুয়ার্টও ওই বৈঠকে অংশ নেবেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতাদের বিরুদ্ধে ‘শিশুহত্যা’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ ও ‘আগ্রাসনের’ অভিযোগ এনে তাদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের দেশের আদালত ও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতাদের প্রকাশ্য বক্তব্যই এসব অপরাধের স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
১৯৮১ সালে বোমা হামলায় নিহত ইরানের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ বেহেশতি এবং অন্য শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় এসব মন্তব্য করেন খামেনি। সেখানে ২০২৫ সাল বলতে ওই বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে।
বার্তায় উল্লেখ করা ‘শিশুহত্যা’র উদাহরণ হিসেবে ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনাও তুলে ধরা হয়। দাবি করা হয়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রথম দিনে ওই বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শতাধিক শিশু নিহত হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, শিক্ষকসহ ১৭৫ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান, যাদের অধিকাংশই শিশু।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ দাবি করেছে, ইসরায়েলের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের জন্য ব্যবহৃত অত্যাধুনিক কম্পিউটারাইজড ব্যাটল হেলমেটসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে সৌদি আরব ও কাতার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাতারের রাজপরিবারের ১১টি বিমানের মধ্যে তিনটিতে ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এলবিটের তৈরি ‘সি-মিউজিক’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে বিমানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের সময় এসব ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়।
হারেৎজ আরও জানিয়েছে, গত বছর তেহরান সফরে কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির ব্যবহৃত বিমানেও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল। এটি রাডারের মাধ্যমে কাঁধ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে এবং শক্তিশালী লেজার রশ্মির সাহায্যে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সক্ষম।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে কাতারের কাছে মার্কিন এফ-১৫ কিউএ আবাবিল যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো উন্নত যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য ১৫ থেকে ২৫ কোটি ডলারের উপ-চুক্তি পায়। এর মধ্যে ১৬০টি জেএইচএমসিএস হেলমেট এবং এএন/এভিএস-৯ নাইট-ভিশন চশমাও ছিল।
এ ছাড়া ২০১০ সালে সৌদি আরবের কাছে এফ-১৫এসএ যুদ্ধবিমান বিক্রির অংশ হিসেবে ৪৬২টি জেএইচএমসিএস হেলমেট ও সমসংখ্যক নাইট-ভিশন চশমা সরবরাহ করা হয় বলে হারেৎজ জানিয়েছে। ইন্টারনেটে প্রকাশিত ভিডিওতেও এসব হেলমেট ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ ডিসপ্লেতে উড্ডয়নসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা যায় এবং পাইলট চোখের ইশারায় লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে আরও নিখুঁতভাবে হামলা পরিচালনা করতে পারেন।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব বা কাতারের কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কিংবা প্রকাশ্য প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নেই।
পড়ুন: প্রথম দল হিসেবে শেষ ষোলোতে কানাডা
আর/


