উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি (এমপিএস) ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে প্রধান নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে এবং গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের এটিই প্রথম মুদ্রানীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, কয়েক মাস মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব আবারও দেশের বাজারে পড়েছে। বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাবে গত মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা না থাকায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ কারণে শুধু নীতি সুদহারই নয়, ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) হারেও কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা এখন সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে। পরে সরকার পরিবর্তনের পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মোস্তাকুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন। নতুন সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে সুদহার কমানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। এ লক্ষ্যে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির কারণে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অন্যদিকে, দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। কিন্তু গত এপ্রিল পর্যন্ত তা অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার ১১ শতাংশের বেশি হওয়ায় প্রকৃত অর্থে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
এর বিপরীতে সরকারি খাতের ঋণ গ্রহণ বাড়ছে। জুন পর্যন্ত সরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬০ শতাংশ, যেখানে এপ্রিল পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরা হচ্ছে নতুন মুদ্রানীতিতে। শক্তিশালী প্রবাসী আয় প্রবাহের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দীর্ঘ ৪৫ মাস পর আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে।
এ ছাড়া ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত রাখার বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। কর্মসংস্থান বাড়াতে কম সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা এবং বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন নীতি সহায়তার কথাও মুদ্রানীতিতে স্থান পেতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের জন্য রূপান্তরযোগ্য টাকা অ্যাকাউন্ট চালু, ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রম জোরদার এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টিও নতুন মুদ্রানীতিতে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
পড়ুন:রাম মন্দির অনুদান কেলেঙ্কারি: ‘ট্রাস্টে মুসলিম থাকলে এতক্ষণে এনকাউন্টার হতো’ কটাক্ষ ওয়াইসির
দেখুন:জয়ের পর শহর জুড়ে চলছে ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাস! |
ইমি/


