উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে সিরাজগঞ্জের যমুনাসহ জেলার অভ্যান্তরী নদ-নদীতে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীর পানি বাড়ায় একদিকে নদীভাঙন ও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হলেও অন্যদিকে এটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে। নতুন পানির জোয়ারে নদীতে বেড়েছে মাছের বিচরণ, ফলে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে জেলেপাড়া ও মাছের আড়তগুলো।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে সদর উপজেলার ১ নম্বর ক্রসবার (চায়না বাঁধ), মতি সাহেবের ঘাট, পুটিয়া, কাজিপুর ও বেলকুচিসহ যমুনা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরতে ব্যস্ত শত শত জেলে ও শখের শিকারি। ঝাঁকি জাল, খেওয়া জাল, বর্শি ও ধিয়াল নিয়ে চলছে মাছ ধরার উৎসব।
জেলেদের জালে এখন ধরা পড়ছে বাতাসী, চিংড়ি, বাসপাতারী, রিটা, পাপতা, গুজি, বাচা, বাগাইর, আইড়, বোয়াল, রুই, কাতলাসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ। পাশাপাশি পুঁটি, টেংরা, শিং ও টাকি মাছের সরবরাহও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ফলে স্থানীয় বাজার ও মাছের আড়তগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে দিন দিন।
মৌসুমি শিকারি আসাদুল ইসলাম বলেন, নতুন পানি আসার পর থেকেই মাছের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বর্শিতে ভালো মাছ ধরা পড়ছে। সুযোগ পেলেই তাই নদীতে মাছ ধরতে আসেন তিনি।
আরেক শিকারি আব্দুল মমিন জানান, সকালে নদীতে নামলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এতে শখের মাছ শিকারিরাও বেশ উৎসাহিত।
পেশাদার জেলে সামিউল শেখ বলেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের পরিমাণও বেড়েছে। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মাছ ধরা পড়ছে। কাজিপুরের জেলে আয়নাল হক জানান, রাতভর মাছ ধরে ভোরে বাজারে বিক্রি করে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন তিনি।
শহরের বড় বাজারের মাছ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগেও ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এখন মাছের সরবরাহ বাড়ায় ব্যবসায় আবারও গতি ফিরেছে এবং সংসারে স্বস্তি এসেছে। জেলেদের ধরা মাছ বিক্রি হচ্ছে মতি সাহেবের ঘাট, বাঔতারা, মেঘাইঘাট ও সোহাগপুর বাজারসহ বিভিন্ন আড়তে। প্রতিদিন এসব স্থানে লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। এখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে যমুনার টাটকা মাছ।
সাইজভেদে আইড় মাছ প্রতি কেজি ৯৫০ থেকে ১,৫৫০ টাকা, ১০ কেজি বা তার বেশি ওজনের বড় আইড় মাছের দাম কিছুটা বেশি। বাঘাইড় মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা কেজি, বোয়াল মাছের আকারভেদে প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, চিতল মাছের প্রতি কেজি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, তবে বড় মাছের পেটি বাদে টুকরা মাছের দাম একটু বেশি হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, জেলার ২৫টি মৎস্য অভয়াশ্রমে সারা বছর মা মাছ সংরক্ষণ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে এসব মাছ ডিম ছাড়ে এবং পোনা ছড়িয়ে পড়ে প্লাবিত এলাকায়। এর ফলে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও মাছ সরবরাহ করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, যমুনায় পানি বৃদ্ধিতে মৎস্যজীবীরাও মাছ ধরে বিক্রি শুরু করেছেন। এতে তাদের পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরছে।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা হার্ড পয়েন্টে যমুনার পানি ৬ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৭৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে কাজিপুরের মেঘাইঘাট পয়েন্টেও পানি ৫ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে পানি এখনও বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোকলেছুর রহমান জানান, যমুনায় দ্রুত পানি বাড়লেও আগামী ১০ দিনের মধ্যে বন্যার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে সদর উপজেলার বাহুকা গ্রাম ও চৌহালীর ভূতের মোড় এলাকায় নদীভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধে কাজ চলছে।
বন্যার শঙ্কা ও নদীভাঙনের উদ্বেগ থাকলেও আপাতত যমুনাপাড়ের মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মাছের প্রাচুর্য। নতুন পানির জোয়ার যেন নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে। জেলে, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ক্রেতা সবার মুখেই এখন স্বস্তির হাসি।
পড়ুন : আরও ৪ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করছে সরকার
সা/


