বিজ্ঞাপন

তৈরি হয়েছে শক্তিশালী ‘এল নিনো’: বৈশ্বিক দুর্যোগের ঝুকি বাড়ছে

এল নিনো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটির আশঙ্কা, চলতি বছরের এল নিনো সামগ্রিক শক্তির দিক থেকে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

এল নিনো হলো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যার সময় মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরণে পরিবর্তন আসে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এ ঘটনা ঘটে এবং প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। এল নিনো ও লা নিনার মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিরপেক্ষ অবস্থাও বিরাজ করে।

সম্প্রতি এএফপির বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএমও দেশগুলোকে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাবে।

ডব্লিউএমও এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অত্যন্ত শক্তিশালী—এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি তৃতীয় স্তর অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাবে।

সংস্থাটি জানায়, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে এর তীব্রতা আরও বাড়বে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাবে।

ডব্লিউএমওর জলবায়ুবিজ্ঞানী আলভারো সিলভা বলেন, আগের মাসের তুলনায় এখন আরও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে যে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে এটি আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিললে সংস্থাটি নতুন হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করবে।

জেনেভাভিত্তিক সংস্থাটি জানিয়েছে, বৈশ্বিক বিভিন্ন জলবায়ু কেন্দ্রের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ অঞ্চলে মৌসুমি গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে। উত্তর গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সবশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৩ সাল রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর ছিল। আর ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উঠে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়ে।

সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনো সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়। তবে এর ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিলভার ভাষ্য, চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত এবং ২০২৭ সালেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব অনুভূত হতে পারে।

কৃষি, স্বাস্থ্যসহ জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএমও। সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, মানুষের জীবন রক্ষা এবং অর্থনীতি ও সমাজে সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হলে বহু অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, স্থলভাগে তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

ডব্লিউএমওর হালনাগাদ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, দক্ষিণ অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব জনবসতিপূর্ণ স্থলভাগে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।

ডব্লিউএমও জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনো আরও ঘনঘন সৃষ্টি হচ্ছে বা এর তীব্রতা বাড়ছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে উষ্ণতর সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল চরম আবহাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও আর্দ্রতা বাড়িয়ে দেওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করতে পারে।

উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মে এল নিনোর কারণে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়তে পারে। বিপরীতে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ও বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে এল নিনোজনিত ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কায় পেরু দেশটির ১ হাজার ৮০০ পৌরসভার মধ্যে ৮০০টিতে ৬০ দিনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দেশটির ৯৩ লাখের বেশি মানুষ বন্যা ও ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে সতর্ক করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্ভাব্য প্রভাব

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: এল নিনোর বছরগুলোতে এ অঞ্চলের অনেক স্থানে শুষ্ক আবহাওয়া ও খরা দেখা দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে ভারতসহ উপমহাদেশে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কৃষি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে।

অস্ট্রেলিয়া: দেশটিতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে। এর ফলে খরা, তাপপ্রবাহ এবং দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে।

আফ্রিকা: হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। তবে দক্ষিণ, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়া ও খরার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকা: উপকূলীয় পেরু ও ইকুয়েডরসহ পশ্চিম দক্ষিণ আমেরিকার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে উত্তর ব্রাজিলে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে, যা আমাজন বনের দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

পড়ুন: ইরাকে খামেনির মরদেহ, গ্রহণ করেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন