ডাকনাম ছিল কাজল, আর জন্মের সময় রাখা নাম শামসুর রহমান। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ফয়জুর রহমান নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রেখেছিলেন। পরে অবশ্য তিনিই সেই নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘হুমায়ূন আহমেদ’। আবার ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামে থাকাকালে পরিচিত ছিলেন ‘বাচ্চু’ নামেও। তবে সময়ের সঙ্গে এসব নাম ছাপিয়ে তিনি পরিচিতি পান ‘হুমায়ূন আহমেদ’ নামেই। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের এক উজ্জ্বল ইতিহাস।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত নেত্রকোনা মহকুমার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তার মূল পরিচয়। ১৯৫৫ সালে সিলেটের কিশোরী মোহন পাঠশালায় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নাম কিশোরী মোহন (বালক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরে তিনি বগুড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৬৫ সালে সেখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর কক্ষে বসেই তিনি রচনা করেন কালজয়ী উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। ১৯৭১ সালে এই হল থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে নির্যাতনের শিকার হন এবং একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হলেও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।
১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে পাঠকসমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন হুমায়ূন আহমেদ। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তার বিষয়বৈচিত্র্যময় অসংখ্য বই। দুই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা এই সাহিত্যিকের সৃষ্টি করা হিমু, মিসির আলী ও শুভ্র চরিত্রগুলো আজও পাঠকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
তার আরেকটি বহুল পরিচিত চরিত্র বাকের ভাই। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মাধ্যমে চরিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরপর নাট্যনির্মাতা হিসেবেও তিনি নিজস্ব স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা করেন। শক্তিশালী গল্প ও ব্যতিক্রমধর্মী সংলাপ তার নাটককে দর্শকের কাছে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
নাটকের পর চলচ্চিত্র নির্মাণেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ এবং শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। এছাড়া ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ও ‘আমার আছে জল’ তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন গীতিকারও। গান সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ ও ‘আমার ভাঙা ঘরে’র মতো তার লেখা গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
ব্যক্তিজীবনে তিনি দুইবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খানের সঙ্গে ২০০৩ সালে বিচ্ছেদের পর ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন।
১৯৮৭ সালে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের পিরুজালী গ্রামে ২২ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের বাগানবাড়ি ‘নুহাশপল্লী’। পরে এর পরিধি বাড়িয়ে ৪০ বিঘা করা হয়।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মলাশয়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। পরবর্তীতে তারই প্রিয় নুহাশপল্লীতে তাকে সমাহিত করা হয়।
পড়ুন: মেসিকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা এমবাপ্পেহুমায়ূন আহমেদ: বাংলা সাহিত্যের অনন্য কথাশিল্পী
আর/


