বিজ্ঞাপন

জলাবদ্ধতার চেয়েও বড় সংকট বিশ্বাসের

কোনো এলাকার উন্নয়ন শুধু ইট-পাথর, ড্রেন বা সড়ক নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি এলাকার প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে সেখানকার মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখার মানসিকতার ওপর। যখন এই বিশ্বাস অটুট থাকে, তখন বড় বড় সংকটও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মোকাবিলা করা সম্ভব হয়। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন শুধু একটি ড্রেনের মুখ নয়, একটি সমাজের বিবেকও যেন আটকে যায়।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েক দিন নিকুঞ্জ-১, জামতলা ও টানপাড়া এলাকার মানুষ এমনই এক কঠিন সময় অতিক্রম করেছেন। টানা বর্ষণে পুরো এলাকা কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। শত শত বাড়িঘরে পানি ঢুকে যায়। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী স্কুলে যেতে পারেনি, ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারেননি, অসুস্থ ও বয়স্ক মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। অনেক পরিবার রাত জেগে ঘরের পানি সেচেছে, কেউ আসবাবপত্র উঁচু করেছে, কেউ আবার চোখের সামনে বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা সংসারকে পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখেছে।

এই দুর্যোগের সময় একটি বিষয় আশার আলো হয়ে সামনে এসেছে। এলাকার সাধারণ মানুষ, নিকুঞ্জ-১ কল্যাণ সোসাইটি, নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ডুবুরি দল একসঙ্গে কাজ করেছেন। কোথাও ম্যানহোল পরিষ্কার হয়েছে, কোথাও ডুবুরি নেমে পানির নিচে আটকে থাকা প্রতিবন্ধকতা সরিয়েছেন, কোথাও পাম্প বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, একটাই লক্ষ্য ছিল—মানুষের কষ্ট কমানো।

নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি এই পুরো সময়টিতে প্রতিদিন মাঠে ছিল। কোথায় পানি আটকে আছে, কোথায় ম্যানহোল বন্ধ, কোথায় পানি চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। শুধু অভিযোগ নয়, সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, নাগরিকের দায়িত্ব শুধু সমালোচনা করা নয়; প্রয়োজনে নিজেই এগিয়ে আসা।

এটি অবশ্য আমাদের প্রথম সামাজিক উদ্যোগ নয়। গত বছরের ৩০ এপ্রিল নিকুঞ্জ টানপাড়া এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছিল, সেটিও ছিল দীর্ঘ আন্দোলন, আলোচনা ও জনসচেতনতার ফল। তখন অনেকে বলেছিলেন, এটি সম্ভব নয়। কিন্তু আজ সেই সিদ্ধান্ত এলাকার নিরাপত্তা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং বাসযোগ্য পরিবেশ রক্ষায় একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

এর পাশাপাশি খেলার মাঠ রক্ষার আন্দোলন, মাদকবিরোধী সামাজিক কার্যক্রম, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল চিহ্নিত করা, রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়—সব ক্ষেত্রেই নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কারণ একটি সামাজিক সংগঠনের শক্তি তার ব্যানারে নয়, মানুষের আস্থায়।

কিন্তু এই আস্থার মাঝেই গতকাল বিকেলে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা শুধু হতাশাজনক নয়, অত্যন্ত উদ্বেগজনকও।

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে খবর আসে, জামতলা-টানপাড়ার পানি নিষ্কাশনের প্রধান আউটগোয়িং পয়েন্টে একটি ট্রাকভর্তি বালু আনা হয়েছে। সেই বালু বস্তায় ভরে ভ্যানে করে পানি চলাচলের মুখে ফেলা হচ্ছে। ঘটনাটি জামতলার এক সচেতন বাসিন্দা মোবাইল ফোনে ধারণ করে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির গ্রুপে পাঠিয়ে দেন।

খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা কয়েকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। সেখানে পৌঁছে দেখি, ইতোমধ্যে একাধিক বালুর বস্তা পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
আমরা প্রশ্ন করেছি—কোন প্রয়োজনে? কার নির্দেশে? কেন এমন একটি সময়ে, যখন শত শত পরিবার এখনো পানিবন্দী, তখন পুরো এলাকার একমাত্র পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে?

দুঃখজনক হলেও সত্য, কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসীর প্রতিবাদ এবং আমাদের দৃঢ় অবস্থানের মুখে সংশ্লিষ্টরা পানিতে ফেলে দেওয়া অন্তত ১৮টি বালুর বস্তা সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিতে বাধ্য হন।

এই ঘটনার সবচেয়ে কষ্টের দিকটি অন্যত্র। গত দশ দিন যাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করেছি, যাদের সঙ্গে একসঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজেছি, তাদের দিক থেকেই যদি এমন একটি উদ্যোগ আসে, তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু একটি পানিপথ বন্ধ করে না; মানুষের বিশ্বাসও নড়বড়ে করে দেয়।

এর আগেও আমরা একই স্থানে আরেকটি দুঃখজনক ঘটনা দেখেছি। কিছু মৎস্যচাষী নিজেদের সুবিধার জন্য বালুর বস্তা ফেলে জামতলার পানি নামার পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তখনও আমরা প্রতিবাদ করেছি। পানি চলাচলের পথ খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটার চেষ্টা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

এগুলো কোনো স্বস্তির খবর নয়। এগুলো একটি সমাজের জন্য নোংরা খবর। কারণ জনস্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গত কয়েক দিনে ম্যানহোল থেকে যে পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, কাদা ও আবর্জনা উদ্ধার হয়েছে, তা আমাদের নাগরিক সচেতনতারও একটি নির্মম চিত্র তুলে ধরে। আমরা নিজেরাই যখন ড্রেনে ময়লা ফেলি, পানি চলাচলের পথ দখল করি, তখন শুধু প্রশাসনকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নাগরিক দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সমস্যা যত বড়ই হোক, মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কাছে তা হার মানতে বাধ্য। কিন্তু সেই প্রচেষ্টার মাঝখানে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে মানুষের উৎসাহে ভাটা পড়ে। যারা দিন-রাত নিজের পরিবারকে সময় না দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করেন, তাদের মন ভেঙে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যায়। আর একটি সমাজে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হলে সেটি যেকোনো অবকাঠামোগত সংকটের চেয়েও ভয়াবহ।

আমরা কাউকে আগেভাগে দোষী বলতে চাই না। আমরা শুধু চাই সত্য উদঘাটিত হোক। কে বা কারা এই উদ্যোগ নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল, কার নির্দেশে নিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।

আমরা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাই, ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনা হোক। কারণ জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন একটি বিষয় কখনোই ধামাচাপা পড়া উচিত নয়।

আজ যদি একজন সচেতন নাগরিক ভিডিও ধারণ না করতেন, যদি বিষয়টি সময়মতো আমাদের নজরে না আসত, তাহলে হয়তো পুরো পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যেত। তখন ক্ষতির পরিমাণ কতটা হতো, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

এই ঘটনার পর আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে। কারণ একটি এলাকার উন্নয়ন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদেরও দায়িত্ব। যে সমাজে মানুষ অন্যায় দেখেও নীরব থাকে, সেখানে সমস্যা কখনো কমে না; বরং বাড়তে থাকে।

নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির পথচলা ভবিষ্যতেও মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করেই চলবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ সড়ক, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, মাদকমুক্ত সমাজ, খেলার মাঠ রক্ষা, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান—এসব কাজ কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের নয়; এগুলো আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
আমরা বিশ্বাস করি, একটি এলাকার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষ যদি একে অপরের প্রতি আস্থা রাখে, জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ায়, তাহলে কোনো সংকটই স্থায়ী হয় না।

কারণ শেষ পর্যন্ত ড্রেনের মুখ বন্ধ করলে হয়তো কিছু সময়ের জন্য পানি আটকে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের বিবেক, সচেতনতা এবং ঐক্যকে কখনো আটকে রাখা যায় না। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই—একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য এবং মানবিক নিকুঞ্জ, জামতলা ও টানপাড়া গড়ে তোলার পথে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও আহবায়ক
নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন