হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, ২০২৬ সালের ১২ জুলাই হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখের কথিত গুমের ঘটনায় বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে কার্যকর তদন্ত শুরু করা উচিত। সংস্থাটির দাবি, মিরাজকে সর্বশেষ কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল এবং গত দুই বছরের মধ্যে এটিই প্রথম পরিচিত জোরপূর্বক গুমের ঘটনা বলে মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধে নেওয়া সংস্কার বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
লন্ডনের স্থানীয় সময় রোববার রাতে এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সরকারের সময় বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই যেকোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শনের অধিকার মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়। তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটির মেয়াদ শেষ হতে দেয় এবং নতুন আইনের প্রস্তাব আনে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের কাছ থেকে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজার হাজার মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। তার মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে কার্যকর সংস্কার ছাড়া এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটতে পারে। তিনি বলেন, এ ধরনের চর্চা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং নতুন সরকারের উচিত কার্যকর সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সংস্থাটি উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জোরপূর্বক গুম বলতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা তাদের নির্দেশে পরিচালিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাউকে আটক বা অপহরণের পর সেই আটক অস্বীকার করা অথবা তার অবস্থান গোপন রাখাকে বোঝায়। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগ দেয়, যার আওতায় গুমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, তদন্ত করা এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এইচআরডব্লিউর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতে সুন্দরবনের কাছে মোংলার জয়মনীর ঘোলে কোস্ট গার্ড সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। পরদিন তার পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে বলা হয় তিনি একটি অভিযানে রয়েছেন এবং পরে আসতে বলা হয়। কিন্তু বিকেলে গেলে জানানো হয়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।
সংস্থাটি আরও জানায়, ২১ এপ্রিল যে চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে তার মোটরসাইকেলটি নিজেকে কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি নিয়ে যান। পরদিন সেটি আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মোজাহেদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা গুমের সময়, স্থান এবং কীভাবে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাকে নিয়ে গিয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
মিরাজের পরিবার অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করলেও কোনো ফল পায়নি। পরে ১২ জুলাই তার বাবা হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট করলে আদালত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বরাবরের মতোই মিরাজকে আটক করার অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, ঘটনাটি অতীতের গুমের ধারা ও নির্যাতনের পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্ত কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন গোপন আটক থেকে ফিরে এলেও অন্তত ২৫১ জন আর ফেরেননি এবং তাদের মৃত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কমিশনের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, গুমের সঙ্গে একটি পদ্ধতিগত নির্যাতনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। অধিকাংশ গোপন আটককেন্দ্রে বিশেষ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ছিল, যেখানে ঘূর্ণায়মান চেয়ার, ঝুলিয়ে নির্যাতনের পুলি ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র এবং তাপীয় নির্যাতনের সরঞ্জাম ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর মধ্যে মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান)-এর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের আগস্টে র্যাব সদস্যরা তাকে আটক করে এবং আট বছর গোপন স্থানে আটকে রাখার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন মুক্তি দেয়। মুক্তির পর তিনি বলেন, “আট বছর আমি সূর্যের আলো দেখিনি… মনে হতো যেন আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে।”
আরমানের ঘটনাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার অংশ। সেখানে র্যাবে দায়িত্ব পালনকারী বর্তমান সেনাবাহিনীর ১০ কর্মকর্তাসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার চলছে।
এছাড়া ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের এক মাস আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২২ জনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন এখনো নিখোঁজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করেন। ওই দুটি আইনে স্বাধীন তদন্ত এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তবে নবনির্বাচিত সরকার এসব অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে নতুন আইনের প্রস্তাব করেছে, যেখানে গুম তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছেই রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রভাব বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সবশেষে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জোরপূর্বক গুমের তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। তার ভাষায়, গুম তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছে থাকলে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধেও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
পড়ুন:
আর/


