টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কারণে যমুনা নদীতে প্রতিদিন পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। একই সাথে বিভিন্ন স্থানে তীব্র নদীভাঙন দেখা দেওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্ট এলাকায় যমুনার পানি ৯ সেন্টিমিটার এবং কাজীপুরের মেঘাইঘাট পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার ৮৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩১টি ইউনিয়নকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন।
টানা বৃষ্টিতে ফলে একদিকে যেমন চরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। বিশেষ করে শাহজাদপুর, চৌহালী ও কাজীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কুরসি গ্রামের বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, যমুনা নদী ভাঙনে আমি সর্বস্বান্ত হয়েছে। গত দুই বছরে যমুনা আমার সব কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানে আমি একেবারেই নিঃস্ব। চরে আমার প্রায় ১৫ বিঘা জমি ছিল। সেই জমিতেই সংসার চলত। কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ ভিজে আসে শুধু কামাল উদ্দিন নন, যমুনার অব্যাহত ভাঙনে জেলার হাজারো মানুষের একই আর্তনাদ চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর গড়ে তোলা স্বপ্নের ঠিকানা।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কাজীপুর উপজেলার চরগিরিশ এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, চলতি মাসেই অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘর ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি যমুনায় বিলীন হয়েছে। এখন ভাঙনের মুখে রয়েছে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরগিরিশ ফ্লাট সেন্টার এবং অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা।
চরগিরিশ এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে যমুনা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে গেছে। যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছরই মানুষকে নতুন করে সর্বস্ব হারাতে হচ্ছে।
শাহজাদপুর উপজেলার কুরসি গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, নদীভাঙনে আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। চরে আমার প্রায় ১০ বিঘা জমি ছিল। যমুনা সব কেড়ে নিয়েছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, জানি না।
একই গ্রামের রউজ উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি নদী আরও কাছে চলে এসেছে। নিজের হাতে গড়া বাড়িটা আর কতদিন থাকবে, সেই দুশ্চিন্তায় রাতেও ঘুম হয় না।
চৌহালী উপজেলার খাসপুকুরিয়া গ্রামের শাহিনুর বেগম বলেন, দুই বছরে তিনবার ঘর সরিয়েছি। এখন আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সন্তানদের নিয়ে এখন কোথায় যাবে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। সবকিছু নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে।
সদর উপজেলার কাওয়াকোল চরাঞ্চলের কৃষক আলী আহমেদ বলেন, শুধু জমি নয়, স্বপ্নও নদীতে ভেসে যাচ্ছে। এবার যে ফসলের আশা ছিল, সেটাও শেষ হয়ে গেল। ঋণের বোঝা কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।
চরগিরিশ এলাকার নৌকার মাঝি সামছুল ব্যাপারী বলেন, ভাঙন এত দ্রুত হচ্ছে যে অনেকেই ঘরের মালামাল পর্যন্ত সরিয়ে নিতে পারছেন না। প্রশাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা না হলে পুরো এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, গত ১৩ জুলাই থেকে টানা ৯দিন ধরে যমুনার পানি বাড়ছে। বর্তমানে শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৬১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং মেঘাইঘাট পয়েন্টে ৯৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ভাঙন ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
তবে, স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক জিও ব্যাগ নয় স্থায়ী নদী শাসনের উদ্যোগ ছাড়া প্রতি বর্ষাতেই যমুনার ভয়াল থাবায় নতুন নতুন পরিবার নিঃস্ব হবে। তারা এই সরকারের কাজে নদী ভাঙ্গণ রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবী জানান।
পড়ুন : সরকার ও দেশকে অস্থিতিশীল করতে ছড়ানো হচ্ছে পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা
সা/


