পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি এবং তরুণদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের নতুন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন ভারতের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে। আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরোধীদের রাজনৈতিক অবস্থান, তারকাদের সমর্থন এবং ভিন্ন ইস্যুতে কৃষকদের বিক্ষোভ।
সব মিলিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এই চাপ সামলে মোদি সরকার কতটা শক্ত অবস্থানে থাকতে পারবে?
তরুণদের ক্ষোভ থেকে জাতীয় ইস্যু
গত মে মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া সিজেপি আন্দোলন অল্প সময়েই ব্যাপক সাড়া ফেলে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তরুণ সমাজের সমস্যা সমাধানে সরকার ও বিরোধী—কোনো পক্ষই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তাদের মূল দাবি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ। তবে দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে ঘিরে পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়।
আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পুলিশের অভিযানে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পর বিরোধী দলগুলোর নেতারা আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ান।
বিক্ষোভে পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে পুলিশ। তিনি সংসদ সদস্যদের রাস্তায় নামা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। সংসদ ভবন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে রাইসিনা রোডে বিক্ষোভকারীদের থামিয়ে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয় এবং সংসদ মার্গ থানার সামনেও লাঠিচার্জ করা হয়।
তারকারা পাশে, বাড়ছে চাপ
শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে ভারতের বিনোদন অঙ্গনের একাধিক পরিচিত মুখ সরব হয়েছেন।
দিলজিৎ দোসাঞ্জ, রিতেশ দেশমুখ, জেনেলিয়া ডি’সুজা, হুমা কুরেশী এবং ভূমি পেডনেকরসহ অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সংগীতশিল্পী শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
দিলজিৎ দোসাঞ্জ পুলিশি অভিযানের সমালোচনা করে বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয় এবং তাদের ক্ষোভ শোনা প্রয়োজন। রিতেশ দেশমুখ ও জেনেলিয়া ডি’সুজাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন।
এছাড়া অরিজিৎ সিং, সোনাক্ষী সিনহাসহ আরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এর আগে যন্তর মন্তরে সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেন শাবানা আজমি ও প্রকাশ রাজ।
তারকাদের প্রকাশ্য সমর্থন আন্দোলনকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে এবং সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।
দিল্লির রাজপথে কৃষকরাও
শিক্ষা খাতের দুর্নীতির প্রতিবাদে সিজেপির আন্দোলনের পাশাপাশি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে পাঞ্জাবের শত শত কৃষকও রাজপথে নামেন।
দুই ভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলনের কারণে রাজধানী দিল্লিতে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ।
রাহুল গান্ধীর পাঁচ দফা দাবি
বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর মুক্তি পান লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।
মুক্তির পর রাহুল গান্ধী কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ, শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিচার, আন্দোলন দমনের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা প্রার্থনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি রয়েছে।
রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অন্যায় করছে এবং তাদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
তরুণদের সংখ্যা ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
ভারতের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৩০ বছরের নিচে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনঅসন্তোষের বিষয়টি বিরোধীরা বুঝতে পেরেছে। তারা তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে এই আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং তা ভারতের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু শিক্ষা দুর্নীতি, তরুণদের ক্ষোভ, তারকাদের সমর্থন এবং বিরোধীদের সক্রিয়তার কারণে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ইতোমধ্যে মোদি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


