মৌলভীবাজারের কুলাউড়া রেঞ্জাধীন বরমাচল বিটের ভাটেরা হিল রিজার্ভ ফরেস্ট (ব্লক-২) এর আওতায় থাকা প্রায় ১৫০ একর সরকারি রিজার্ভ বনভূমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা (Status Quo) তোয়াক্কা না করেই অবাধে চলছে বন দখল, গাছ কর্তন এবং জমি উজার করার পাঁয়তারা। স্থানীয় খাসিয়া সম্প্রদায়ের একাংশ নিজেদের ‘দুর্বল’ ও প্রান্তিক হিসেবে জাহির করলেও, প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় একশ্রেণীর প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও নেপথ্য মদদেই তারা দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করেন কুলাউড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস। তবে বিস্ময়করভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অভিযানের সময় বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।
অভিযানকালে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য চন্দন কুর্মি এবং ইচ্ছালছড়া পান পুঞ্জির প্রধান (মন্ত্রী) লিডিয়া পিয়া প্রশাসনের কাছে বনের গাছ কাটার বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তারা দাবি করেন, তারা গাছ কাটার পক্ষে নন এবং কোনো গাছ কাটা হচ্ছে কি না তাও তাদের জানা নেই। তবে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে চাইলে তারা নানা অজুহাতে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে এসিল্যান্ড দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে জবরদখল ও তাজা গাছ কেটে সুপারি চারা রোপণসহ বন উজারের স্পষ্ট প্রমাণ পান। কিন্তু কৌশলগতভাবে অপরাধীদের আড়াল করে রাখা এবং সুনির্দিষ্ট অভিযুক্তদের হাতেনাতে না পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তি বা জরিমানা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
একই সাথে এই প্রতিবেদকের নিজস্ব অনুসন্ধানেও উক্ত বনাঞ্চলে ব্যাপক হারে ও জোরেসোরে গাছ কাটার একাধিক চাঞ্চল্যকর প্রমাণ মিলেছে। তবে ওই এলাকায় প্রভাবশালী চক্র ও দখলদারদের সশস্ত্র মহড়া এবং তীব্র প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী বা সাধারণ বাসিন্দাদের বক্তব্য রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি।
সংযুক্ত সরকারি নথি ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ১৩৭১, তারিখ: ২৫/০৭/২০২৬ এবং জিডি নং- ৯৮২, তারিখ: ২০/০৭/২০২৪) পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কুলাউড়া সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে (স্বত্ব মামলা নং- ১৮৫/২০২২) এই ১৫০ একর বনভূমি নিয়ে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত উভয় পক্ষকে ওই জমিতে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার আদেশ প্রদান করেছিলেন। কিন্তু আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইচ্ছালছড়া পান পুঞ্জির হরলাল পথাং (৫১), লিডিয়া পিয়া (৪০), আলফায়েস পথাং (৪৪), জনি সিঙ্গা (৩০) সহ একদল লোক লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রিজার্ভ ফরেস্টে মহড়া দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় সুবিধাবাদী ও প্রভাবশালী মহলের গোপন আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকায় তারা সরকারি বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্যে প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক গাছপালা কেটে বনভূমি দখল ও জুম চাষের সাহস পাচ্ছে। বরমাচল বিট কর্মকর্তা (ফরেস্টার) মোঃ আবদুল ওয়াদুদ বারবার থানায় জিডি করলেও পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
ঘটনা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিষয়ে জানতে চাইলে কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জহিরুল ইসলাম মুন্না মুঠোফোনে জানান, “বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশনায় পুলিশ প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালিয়ে আসছে। ক্ষেত্রবিশেষে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সরকারি জমি সুরক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রণয় বিশ্বাস জানান, “আমরা সরেজমিনে গিয়ে বন উজারের আলামত পেয়েছি। নেপথ্যে যাদেরই ইন্ধন থাকুক বা আদালতের আদেশ অমান্য করে সরকারি জমিতে যারা অবৈধ কার্যক্রম চালাবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
উপজেলা বন কর্মকর্তা (রেঞ্জ কর্মকর্তা) রবীন্দ্র কুমার সিংহ বলেন, “আমাদের পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। একদিকে প্রভাবশালী চক্রের হুমকি-ধামকি, অন্যদিকে জনবল সংকট—সব মিলিয়ে আমরা চরম ঝুঁকিতে কাজ করছি। তবুও সরকারি সম্পদ রক্ষায় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে অবহিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার জানান, “আদালতের স্থিতাবস্থার আদেশ অমান্য করে সরকারি রিজার্ভ বনভূমি দখল বা গাছ কাটার কোনো সুযোগ নেই। এই অপকর্মের পেছনে যারা মদদ দিচ্ছে এবং যারা সরাসরি জড়িত, তাদের সবাইকে আইনি আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে সচেতন মহল জানান, বন বিভাগের চরম জনবল সংকট এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছায়ায় খাসিয়াদের লাগাতার হুমকিস্বরূপ আচরণের কারণে বন কর্মকর্তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। রিজার্ভ ফরেস্ট রক্ষায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে জেলা সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ নাজমুল আলমের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বনাঞ্চলের ভূমিকা অপরিসীম। অথচ কুলাউড়ায় একদিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ‘দুর্বলতার’ দোহাই, অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের কায়েমী স্বার্থের কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনুসন্ধানে গাছ কাটার জোরালো প্রমাণ মেলা এবং আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রাজনৈতিক ও স্থানীয় মদদে রিজার্ভ ফরেস্টে একের পর এক জিডি হওয়ার পরও দখলের উৎসব চলে—তা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ যেখানে প্রাণভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না, সেখানে প্রশাসন ও পুলিশ নিয়মিত অভিযানের কথা বললেও বাস্তবে বন উজারের গতি থামছে না। বন বিভাগের তীব্র জনবল সংকট এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নীরবতা ভূমিদস্যুদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে। অবিলম্বে পর্দার আড়ালের প্রভাবশালী চক্রসহ সকল অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় না আনলে কুলাউড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন—আর কত বন উজার হলে টনক নড়বে প্রশাসনের?
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

