মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার পুলিশ হেফাজতে থাকা একটি মোটরসাইকেল থানা প্রাঙ্গণ থেকে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. এমদাদুল হকসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা এবং মোটরসাইকেলটি থানা থেকে অপসারণে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের মালিককেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়া মোটরসাইকেলটির নম্বর মানিকগঞ্জ-ল-১১-৩৬৩৭, এর মালিক সিয়াম শেখ, উপজেলার চালা ইউনিয়নের সট্টি এলাকার শাহিন শেখের ছেলে।
মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৭ জুলাই একটি মামলার কপি সংগ্রহের জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে হরিরামপুর থানায় যান সিয়াম। এ সময় থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. এমদাদুল হক মোটরসাইকেলের কাগজপত্র দেখতে চান। তাৎক্ষণিকভাবে কাগজপত্র দেখাতে না পারায় মোটরসাইকেলটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলের চাবি রেখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরে দেখানোর জন্য সিয়ামকে বলা হয়।
পরে সিয়াম ও তার ভাই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে থানায় গেলে তাদের জানানো হয়, মামলা নিষ্পত্তির পর মোটরসাইকেলটি নিয়ে যেতে হবে। তবে প্রায় দুই দিন পর থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়, মামলা নিষ্পত্তির প্রয়োজন নেই এবং থানায় এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যেতে পারবেন।
এরপর গত ৪ আগস্ট সিয়ামের মামাতো ভাই রাজিব মোটরসাইকেলটির বিষয়ে জানতে থানায় গেলে এসআই এমদাদুল হক তাকে জানান, মোটরসাইকেলটি থানা থেকে নিখোঁজ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় মোটরসাইকেলটির পরিবর্তে এর ক্রয়মূল্য বা বর্তমান মূল্য পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রায় ১৫ দিন সময় চাওয়া হয়।
মালিকপক্ষের দাবি, মোটরসাইকেলটির চাবি প্রথমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেন্ট্রির মাধ্যমে ডিউটি অফিসারের কাছে সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয়। পরে সেন্ট্রি চাবিটি এএসআই মো. শহিদের কাছে হস্তান্তর করেন এবং তিনি তা ডিউটি অফিসারের ড্রয়ারে রাখেন বলে জানা গেছে। তবে পরবর্তীতে চাবিটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এদিকে পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, গত ১ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টা ১৯ মিনিটের দিকে মোটরসাইকেলটি বাইরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। তবে ফুটেজে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং মোটরসাইকেলটি কীভাবে বা কার মাধ্যমে থানা থেকে বাইরে নেওয়া হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় এসআই মো. এমদাদুল হক ছাড়াও কনস্টেবল মো. রুবেল আহমেদ ও কনস্টেবল মো. নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে কনস্টেবল নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে থানার চলাচলের পথ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মোটরসাইকেলটি বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে মোটরসাইকেলটি বিক্রি করে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করেছে মালিকপক্ষ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত অন্য পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মোটরসাইকেলের মালিক সিয়াম শেখ বলেন, “একটি মামলার কপি আনতে গেলে সঙ্গে মোটরসাইকেলের কাগজপত্র না থাকায় এসআই এমদাদুল মামলা দিয়ে মোটরসাইকেলটি রেখে দেন। পরে মোটরসাইকেল আনতে গিয়ে শুনি চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর জানতে পারি মোটরসাইকেলটিই চুরি হয়ে গেছে। পুলিশ হেফাজত থেকে মোটরসাইকেল কীভাবে চুরি হলো, সেটি তদন্ত করে বের করা দরকার। আমি সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।”
সিয়ামের মামাতো ভাই রাজিব বলেন, “আমাদের মোটরসাইকেলের ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকা দিতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা মোটরসাইকেল বিক্রি করতে চাইনি। আমরা আমাদের মোটরসাইকেল ফেরত চাই।”
অভিযোগের বিষয়ে এসআই মো. এমদাদুল হক বলেন, “মোটরসাইকেলের কাগজপত্র না থাকায় মামলা দিয়ে সেটি জব্দ করা হয়েছিল। আমার হেফাজত থেকেই মোটরসাইকেলটি মিসিং হয়েছে। মোটরসাইকেল উদ্ধার ও বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
হরিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আফজাল হোসেন বলেন, “নম্বর প্লেটবিহীন মোটরসাইকেলটির বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে সেটি জব্দ করেছিলেন এসআই এমদাদুল। কয়েকদিন পর মালিককে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলটি মিসিং। থানার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। মোটরসাইকেলটির মালিকসহ সংশ্লিষ্টদেরও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে।”
ঘটনার এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও নিখোঁজ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার না হওয়ায় মালিকপক্ষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা একটি জব্দকৃত মোটরসাইকেল কীভাবে থানার প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে গেল এবং এর পেছনে কারা জড়িত—তা তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন : এটিইও-র পর এবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেই সহকর্মীর অভিযোগ


