২০২৫ সালে জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র জাতীয় প্রাণহানী বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১শত ১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছে। মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার ৩৮.২২ শতাংশ, সংঘটিত হয়েছে। বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তার পর্যবেক্ষক সংস্থা (বাংলাদশে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং রোড সেফটি ফাউন্ডেশন) জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে যে তথ্য থেকে পাওয়া যায়।
জাতীয় মহাসড়কগুলোতে (যার মধ্যে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অন্যতম)। বিভাগীয় রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৭.৫৫ শতাংশ রাজশাহী বিভাগে এবং ২০.৪৭ শতাংশ ঢাকা বিভাগে ঘটে থাকে। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের আর্থিক ক্ষতির পরমিাণ নিদিষ্ট টাকার হিসাব না থাকলে, যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে বার্ষিক গড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি ২০২৬ সালরে পুর্ণাঙ্গ বার্ষিক প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তবে হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, পুঠিয়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইলসহ ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাস, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের বেশ কছিু মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রাজশাহী-ঢাকা জাতীয় মহাসড়কে প্রতিদিন গড়ে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০টি ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার মতো উৎসব-পার্বণের সময় এই সংখ্যা ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ ছাড়িয়ে যায়। (নির্দিষ্ট সেকশন বা সড়ক বিভাগের ট্রাফিক কাউন্টিং সার্ভে অনুযায়ী এই সংখ্যায় কিছুটা তারতম্য হতে পারে)।
রাজশাহী-ঢাকা সড়কে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহ হলো। অতিরিক্ত গতি ও বিপদজ্জনক ওভারটেকিং, অপ্রশস্ত ও বাঁকবহুল সড়কেও চালকরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য প্রতিযোগিতা করে ওভারটেক করেন। বিশেষ করে মোড় বা বাঁকের মুখে বেপরোয়া ওভারটেকিং মারাত্মক দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।
সড়কের অপ্রশস্ততা ও লেন শৃঙ্খলার অভাব: রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কটি এখনো পুরোপুরি ডিভাইডারযুক্ত চার লেনে উন্নীত না হওয়ায় একই লেনে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে। গতির বৈষম্য একই সড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাক এবং ধীরগতির নসিমন, করিমন, সিএনজি, অটো রিকশা ও ভটভটি চলাচল করে। গতির এই বিশাল পার্থক্যের কারণে দ্রুতগতির গাড়িগুলো হঠাৎ ব্রেক চাপতে বা ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে।
চালকদের ক্লান্তি ও অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা- দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকচালকরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পেয়ে টানা গাড়ি চালান। ক্লান্তি ও ঘুমের ঘোরে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে বিশেষ করে শেষ রাত বা ভোরে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, দক্ষতার অভাব, ট্রাফিক আইনের অজ্ঞতা এবং সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালকের আসনে বসে পড়া দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। অবৈধ পার্কিং ও সড়কে দখলদারি। মহাসড়কের ওপর হাট-বাজার বসা, এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্ক করে রাখা এবং হঠাৎ পথচারীদের রাস্তা পারাপার হওয়া সড়ককে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ ব্রেক, পুরাতন টায়ার, কিংবা অকার্যকর লাইটের যানবাহন নিয়ে মহাসড়কে চলাচলের কারণে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয় এবং দুর্ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর জেলা বা বিভাগভিত্তিক হালনাগাদ তথ্যানুসারে রাজশাহী অঞ্চলে (রাজশাহী জেলা ও সংলগ্ন সার্কেলসমূহ) নিবন্ধিত মোটরযানের একটি সার্বিক চিত্র হলো। রাজশাহী অঞ্চলে নিবন্ধিত প্রধান যানবাহনের ধরণ আনুমানিক নিবন্ধিত সংখ্যা বিবরণ ও বৈশিষ্ট্য হলো মাটরসাইকেল ১ লক্ষ ২০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৪০ হাজার, রাজশাহীতে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল যানবাহন। মোট নিবন্ধিত মোটরযানের প্রায় ৭০% থেকে ৭৫% মোটরসাইকেল। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও জিপ ১২ থেকে ১৫ হাজার। যা ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের জন্য মূলত নিবন্ধিত। মালামাল বহনকারী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার। এখানে মিনিট্রাক, মাঝারি ও ভারী ট্রাক এবং কাভার্ডভ্যানসহ পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহন। যাত্রীবাহী বাস ও মিনিবাস ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার। যা দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা রুটে চলাচলকারী বাস এবং মিনিবাসের অন্তর্ভুক্ত।
রাজশাহী বিভাগের (৮টি জেলা মিলিয়ে) কথা বিবেচনা করলে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লক্ষাধিক, যার বড় একটি অংশই মোটরসাইকেল ও হালকা যান। সরকারি লাইসেন্সকৃত উল্লেখিত মোটরযান ছাড়াও রাজশাহী শহর ও আশেপাশের মহাসড়কে প্রচুর সংখ্যক অটো-রিকশা, থ্রি-হুইলার (সিএনজি এবং ইজি বাইক) এবং নসিমন-করিমন চলাচল করে যেগুলোর বড় অংশই বিআরটি এর কর্তৃক মোটরযান হিসেবে নিবন্ধিত নয়, বরং স্থানীয় পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স বা অনুমতি নিয়ে চলাচল করে।
মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকার নীতিগত, অবকাঠামোগত এবং প্রযুক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সাথে বিআরটিএ-এর রাজশাহী কার্যালয় এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে। মহাসড়কের দুর্ঘটনা এড়াতে সরকারের প্রধান পদক্ষেপ সমূহ নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন ও বাস্তবায়ন করা। সড়ক পরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং সমন্বিত ‘রোড সেফটি অ্যাক্ট’ নিয়ে কাজ জোরদার করা হয়েছে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোকে সার্ভিস লেনসহ ৪-লেনে রূপান্তর করা হচ্ছে, যাতে মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝুঁকি দূর হয়। ব্ল্যাক স্পট বা দুর্ঘটনা প্রবণ স্থান চিহ্নিতকরণ মহাসড়কের যে স্থানগুলোতে বারবার দুর্ঘটনা ঘটে সেখানে বাঁক সোজা করা, সাইনবোর্ড-মার্কার বসানো এবং সড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। গতিসীমা নির্দেশিকা ২০২৪ সম্প্রতি জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের জন্য যানবাহনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট গতিসীমা নির্ধারণ ও গতি পর্যবেক্ষণ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট, হাইওয়ে পুলিশ স্পিড গানের সাহায্যে গতি মেপে বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানা করছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাইয়ে নিয়মিত বিআরটিএ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে। ধীরগতির যানের পৃথক লেন, মহাসড়কে দ্রুতগামী বাসের সাথে নসিমন, করিমন বা সিএনজি রিকশা বন্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এবং ডেডিকেটেড সার্ভিস রোড তৈরি করা হচ্ছে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন (ট্রাফিক) উপ-পরিচালক নুর আলম সিদ্দিকী এবং রাজশাহী অঞ্চলের (বিআরটি) পরিচালক পার্কন চৌধুরী (পরিচালক, ইঞ্জিনিয়ারিং অতিরিক্ত দায়িত্ব) বলেন, সর্ব প্রথম গাড়ি চালক ও পথচারীদের সকল নিদের্শনা মেনে চলতে হবে। মহাসড়কের লেন বুঝে গাড়ি চালাতে হবে। অনিবন্ধিত যানবাহনে কঠর আইন প্রয়োগ করতে হবে। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের গাড়ির লাইসেন্স প্রদান থেকে বিরত থাকেত হবে। অবৈধ কোন নেশা সেবন করে গাড়ি চালনা যাবে না। অতিরিক্ত গাড়ি চালান থেকে বিরত থাকতে হবে। সকল প্রকার যারবাহন প্রধান প্রধান মহাসড়কে চলাচলে জোড়াল পদক্ষেপ নিতে হবে বলেন জানান।
পড়ুন : বোদায় ১৬ শিক্ষক কর্মচারীর মাদ্রাসায় ৭ পরীক্ষার্থী, পাশ করেছে ১জন


