দেশের বাজারে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। গত ছয় মাসে বিভিন্ন জাতের সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ৭০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বর্তমানে ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় উঠেছে। কোথাও কোথাও উন্নত মানের চালের দাম আরও বেশি।
মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ রপ্তানির অনুমোদন, কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি, আবার কেউ চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ তুলছেন। তবে রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। ফলে সীমিত রপ্তানির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে এতটা মূল্যবৃদ্ধি কেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত চাল আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রপ্তানি করার কথা। তবে বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির দাবি, গত এক মাসে প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে মাত্র প্রায় ২ হাজার টন।
অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ রপ্তানির অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে তার সামান্য অংশই বিদেশে গেছে। এরপরও দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম দ্রুত বেড়েছে।
ছয় মাসে কেজিতে বেড়েছে ৭০-৯০ টাকা
রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বছরের শুরুতে যে সুগন্ধি চাল ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে, এখন সেই চালের দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা জাতের প্যাকেটজাত চাল বিভিন্ন ব্র্যান্ডে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা সুগন্ধি চালের দাম মানভেদে ১৬০ থেকে ২০০ টাকা।
চট্টগ্রামের বাজারেও চিনিগুঁড়া চালের দাম কয়েক মাসের ব্যবধানে কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। সেখানে বর্তমানে মানভেদে এই চাল ১৬০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর একাধিক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের উপায় থাকছে না।
এক ব্যবসায়ীর হিসাবে, ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তা এক মাস আগে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন তা প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা।
রপ্তানিকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা
চাকতাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজমের দাবি, সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই দেশের বাজারে দাম বেড়েছে। তার মতে, রপ্তানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চালের দাম বাড়িয়েছে।
পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও রপ্তানির বিষয়টি নিয়ে একই ধরনের আলোচনা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আগামী দিনগুলোতে পাইকারি বাজারে দাম আরও বাড়তে পারে।
‘রপ্তানি নয়, মজুতদারিই দায়ী’
তবে রপ্তানিকারকরা মূল্যবৃদ্ধির জন্য রপ্তানির অনুমোদনকে দায়ী করার বিরোধিতা করছেন। বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন বলেন, গত এক মাসে মাত্র প্রায় ২ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছে। দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় এই পরিমাণ খুবই কম। তার দাবি, দেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। ফলে প্রায় ৬ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকার কথা। এ অবস্থায় সামান্য পরিমাণ রপ্তানির কারণে দেশের বাজারে সরবরাহ সংকট হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন তিনি। ইশাকুল হোসেনের অভিযোগ, কিছু চালকল মালিক বাজার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চাল মজুত করছেন এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছেন।
মিল মালিকদের যুক্তি আন্তর্জাতিক বাজার
তবে চালকল মালিকদের বক্তব্য ভিন্ন। নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক ফারহান হোসেন চাকদারের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা ও দাম বেড়েছে। এর প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে।
তার ভাষায়, বিদেশে চাহিদা ও দাম বাড়ার কারণেই দেশে সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে; অন্য বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে গৌণ।
অন্যদিকে বাজারসংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুগন্ধি ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি এবং বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে চাহিদা বৃদ্ধিও দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে সুগন্ধি চালের রপ্তানি বন্ধ রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
রপ্তানি মূল্য প্রায় ১৯৭ টাকা
ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হারে এর মূল্য প্রায় ১৯৭ টাকার সমান। তাদের যুক্তি, কিছুদিন আগেও দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম রপ্তানি মূল্যের তুলনায় অনেক কম ছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের ব্যবধান কমে এসেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—রপ্তানি যদি মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হয়, তাহলে গত এক মাসে মাত্র প্রায় ২ হাজার টন রপ্তানির পরও দেশের বাজারে কেজিপ্রতি ২০-৩০ টাকা এবং ছয় মাসে ৭০-৯০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ল কেন?
সরকারের কাছেও পরিষ্কার নয় কারণ
সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদনের কারণে সম্প্রতি দেশে দাম বেড়েছে—এমন তথ্য তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি শাখার অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই তিনি প্রথম মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি জানতে পেরেছেন। রপ্তানি অনুমোদনের অভ্যন্তরীণ বাজারে কী প্রভাব পড়েছে, তা মন্ত্রণালয় বিশ্লেষণ করবে। তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
ভোক্তার পাতে কমছে পোলাও
মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভোক্তাদের ওপর। রাজধানীর মিরপুর-৬ বাজারে সম্প্রতি এক গৃহিণী তিন কেজি পোলাও চাল হাতে নিয়েও দাম শুনে দুই কেজি রেখে দেন। শেষ পর্যন্ত এক কেজি চাল কিনে বাজার শেষ করেন তিনি। তিনি জানান, আগে মাসে এক-দুবার পোলাও রান্না হলেও এখন বিশেষ দিন ছাড়া সুগন্ধি চাল কেনার সাহস হয় না। একই বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, আগে অনেক ক্রেতা পাঁচ বা ১০ কেজি করে সুগন্ধি চাল কিনলেও এখন অধিকাংশ ক্রেতা এক-দুই কেজির বেশি নিচ্ছেন না। কেউ কেউ দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।
সাধারণ চালের সঙ্গে সুগন্ধি চালের দামের ব্যবধানও এখন অনেক বেশি। বাজারে সাধারণ মোটা চাল ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা এবং মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৭৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও সুগন্ধি চালের দাম ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
হিসাব মিলছে না কোথায়?
সুগন্ধি চালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—দেশে উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে সরবরাহ সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? রপ্তানিকারকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৬ লাখ টন সুগন্ধি চাল উদ্বৃত্ত থাকার কথা। আর রপ্তানি হয়েছে মাত্র প্রায় ২ হাজার টন। অন্যদিকে বাজারে পাইকারি সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা এবং মিল মালিকরা আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদাকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক জিএম মনিরুল আলমের মতে, সুগন্ধি চাল সাধারণত অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য হিসেবে বিবেচিত হয় না। ফলে এর দাম মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। তার মতে, রপ্তানি শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অভ্যন্তরীণ বাজারের দামকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিতে রপ্তানির প্রভাব কতটা এবং মজুত বা বাজার কারসাজির ভূমিকা কতটা—তা নির্ধারণে সরকারের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।
পড়ুন: সারাদেশে চলছে তীব্র লোডশেডিং, চরম ভোগান্তিতে গ্রামের মানুষ
আর/


