বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক আলোচনায় সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ক্রমাগত বেড়েছে। ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা সংস্থা বিল্ড আপ-এর একটি বেসলাইন বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ফেসবুক, টিকটক ও এক্স (সাবেক টুইটার) মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ কনটেন্ট সংগ্রহ করে তার মধ্যে ৭১ হাজারের বেশি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশজুড়ে ছিল নির্বাচন, বিচার-জবাবদিহিতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেসবুকেই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে — তিন মাসে প্রায় ২৪ হাজার ৯০০ পোস্টে প্রায় সাড়ে চার কোটি লাইক, ৭৯ লাখ শেয়ার ও ১০ লাখ ৬০ হাজার কমেন্ট রেকর্ড করা হয়েছে। টিকটকে পোস্টের সংখ্যা কম হলেও (প্রায় ৭ হাজার ৯৩০টি ভিডিও) প্রতি-পোস্ট সম্পৃক্ততার হার ছিল তুলনামূলক অনেক বেশি — প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ লাইক রেকর্ড হয়েছে এসব ভিডিওতে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ডিজিটাল প্রতিযোগিতা
বিল্ড আপের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামী — এই তিনটি দল ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় কনটেন্ট-নির্মাতাদের তালিকায় রয়েছে, যদিও সব সময় তারাই সর্বোচ্চ সম্পৃক্ততা পায়নি; সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের পাতাও অনেক ক্ষেত্রে সমান বা বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। শীর্ষ ১০-১১টি অ্যাকাউন্ট মিলিয়ে মোট পোস্টের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা পোস্টের একটি বড় অংশ এসেছে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ পাতা ও তাদের সহযোগী সংগঠন থেকে, সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে বেশি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি জরিপে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ৭০ শতাংশ অনুকূল জনমত পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত করা হয়েছে — যা অনলাইনের সমালোচনামূলক আবহের সঙ্গে সরাসরি মেলে না। বিল্ড আপ নিজেই এই ফারাককে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জামায়াতের ‘ডিজিটাল হাইপ’ থেকে ঐতিহাসিক জয়
নির্বাচন-পূর্ব সময়ে জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত অনলাইন প্রচারণা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক জালালউদ্দিন শিকদার প্রথম আলোয় তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন, ভোটের আগে সামাজিক মাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারে — রাজনৈতিক পরিভাষায় যাকে তিনি বলেছেন ‘পারসেপশন অব উইনেবিলিটি’।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে, আর জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট ৭৭টি আসন পায়, যার মধ্যে জামায়াত এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন — দলটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ফল। শিকদারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন, তুলনামূলক কম ভোটার উপস্থিতি (প্রায় ৬০ শতাংশ) এবং জামায়াতের সুশৃঙ্খল ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন এই ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন — কেবল অনলাইন প্রচারণা নয়।
তবে এই ফলাফল কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে শিকদার নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর বিশ্লেষণে। তাঁর ভাষ্যে, তরুণ ভোটারদের সমর্থনের একটি অংশ ‘সাময়িক ডিজিটাল আবেগ’ থেকেও আসতে পারে, যা ভবিষ্যতে নীতিগত পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে বদলেও যেতে পারে — এটি প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়, বরং তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা।
‘সমান্তরাল সরকার’ নিয়ে বিতর্ক
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে আলোচিত একটি মতামত-নিবন্ধ লিখেছেন সাংবাদিক অদিতি করিম, ঢাকা টাইমস পত্রিকায় ওই নিবন্ধে তিনি দাবি করেছেন, প্রমাণ ছাড়াই ছড়ানো অনলাইন কনটেন্টের ভয়ে প্রশাসনিক পদোন্নতি স্থগিত হওয়া এবং বিচারিক সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়ার একাধিক ঘটনা তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই বর্ণনাগুলো লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও মতামত হিসেবে প্রকাশিত, স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত ঘটনা হিসেবে নয় — তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য না বলে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখাই সংগত।
একই নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, ফেসবুক-ইউটিউবের কোনো স্থানীয় কার্যালয় বা জবাবদিহিতা কাঠামো বাংলাদেশে নেই, যদিও মেটা বা গুগলের দিক থেকে এই তথ্যের সরাসরি নিশ্চয়তা আমরা পাইনি। নিবন্ধে ফ্রান্স ও আয়ারল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক সংস্থার করা জরিমানা এবং অস্ট্রেলিয়া-ভারতের নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের উদাহরণ টেনে বাংলাদেশেও অনুরূপ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অনলাইন এনগেজমেন্ট বনাম বাস্তব জনমত
গবেষকদের একাংশ সতর্ক করছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতিকে সরাসরি জাতীয় জনমতের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে। স্ট্যাটকাউন্টারের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে ফেসবুকের বাজার হিস্যা (মার্কেট শেয়ার) প্রায় ৭২ শতাংশ এবং ইউটিউবের প্রায় ২১ শতাংশ। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার — এটি সরাসরি ব্যবহারকারীর জরিপ নয়, বরং পেজভিউ-ভিত্তিক আপেক্ষিক বাজার হিস্যা, যা মাস ভেদে ওঠানামা করে।
দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের গঠনও সুষম নয়। মোবাইল খাতের বৈশ্বিক সংস্থা জিএসএমএ-র ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে নারী-পুরুষ ব্যবধান গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ, আর দক্ষিণ এশিয়ায় এই ব্যবধান আরও বেশি — প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্য রাজনৈতিক অনলাইন আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগেও প্রতিফলিত হয়, ফলে নগরকেন্দ্রিক, তরুণ ও পুরুষ-প্রধান অনলাইন কণ্ঠস্বরকে দেশের সামগ্রিক জনমত হিসেবে দেখাটা ঝুঁকিপূর্ণ।
ভিন্নমত
সব বিশ্লেষক অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবকে একপেশেভাবে নেতিবাচক দেখছেন না। বিল্ড আপের প্রতিবেদনেও উল্লেখ আছে যে সহিংসতা প্রশমন ও সম্প্রীতির পক্ষে আহ্বান জানানো কনটেন্ট সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ততা পাওয়া বিষয়গুলোর একটি — প্রায় ৭ হাজার ৭০০ পোস্টে ১২ কোটির বেশি লাইক রেকর্ড হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, সোশ্যাল মিডিয়া কেবল বিভাজন নয়, সংহতিরও একটি সক্রিয় ক্ষেত্র হতে পারে। সমালোচকদের যুক্তি অবশ্য থেকে যায়— সংগঠিত প্রচারণা ও দলীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যেহেতু কৃত্রিমভাবে ‘জনমত’ তৈরি করা সম্ভব, তাই নীতিনির্ধারকদের এই সংকেতের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ।
উপসংহার
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পর বাংলাদেশে এখন বিএনপির নেতৃত্বে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে রয়েছে। তা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বিদ্যমান গবেষণা মূলত দেখায় যে সোশ্যাল মিডিয়া রাজনৈতিক বয়ান, বৈধতা নিয়ে বিতর্ক ও নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করছে; এটি সরাসরি সরকারি নীতি-সিদ্ধান্তকে কীভাবে ও কতটা বদলাচ্ছে, তার জন্য আরও সুনির্দিষ্ট, case-by-case প্রমাণ প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ পদ্ধতি এবং প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহিতার কাঠামো ছাড়া কেবল অনলাইন এনগেজমেন্টের ওপর নির্ভরতা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মো. মেহেদী হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র


