বিজ্ঞাপন

ফেরদৌস স্টিলে ৯ প্রাণহানি : জাহাজের ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাসের রহস্য খুঁজতে তদন্ত দল

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় দুর্ঘটনার নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে একাধিক তদন্ত দল। প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুরোনো এলএনজি বহনকারী জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে বিপজ্জনক মাত্রায় বিষাক্ত গ্যাস জমে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এখন ওই গ্যাসের উৎস ও দুর্ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক নিশ্চিত করতে চলছে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পরীক্ষা।

গত শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ‘এমটি রাসি’ নামের একটি পুরোনো জাহাজ কাটার সময় শ্রমিকরা বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। এতে ৯ শ্রমিক মারা যান। আহত হন আরও ১০ জন।

প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের ‘এমটি রাসি’ জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। জাহাজটি কাটার সময় এর ব্যালাস্ট ট্যাংক এলাকায় গ্যাসের উপস্থিতিই এখন তদন্তের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আজক বিকালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটির অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাহাজটি পরিদর্শন করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি থাকার কথা থাকলেও সেখানে বিপজ্জনক মাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শেই শ্রমিকদের প্রাণহানি হয়ে থাকতে পারে। তবে গ্যাসের সঠিক মাত্রা ও দুর্ঘটনার কারণ নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।

তদন্ত কমিটির প্রধান এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, দুর্ঘটনার পেছনে কারও গাফিলতি ছিল কি না, ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, জাহাজটির ভেতরে আরও কোনো বিষাক্ত গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গ্যাসের মাত্রা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ‘প্রান্তিক’ ও ‘আলিফ’ নামের দুটি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ দল জাহাজের সংশ্লিষ্ট অংশে গ্যাসের পরিমাণ পরীক্ষা করবে। এ কাজে ঢাকাসহ বুয়েটের বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হয়েছে।

তদন্তে শুধু গ্যাসের উৎস নয়, দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের পিপিই ছিল কি না, ইয়ার্ডে জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, বৈরী আবহাওয়ার কারণে শুরুতে ঘটনাস্থলে সরেজমিন কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন শিল্প সচিবের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় শ্রমিক, বাসিন্দা ও শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে জাহাজ কাটার কাজ চলছিল। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত শেষেই নিশ্চিত হবে।

দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি মো. মহসিন জানান, নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, অর্থ দিয়ে মানুষের প্রাণের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন সবার দায়িত্ব।

তিনি আরও জানান, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় প্রত্যেক পরিবারকে নগদ এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী লেবার কোর্টে আরও দুই লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদক সেবনের দায়ে কবিরাজসহ ৯ জনের কারাদণ্ড

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন