বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়ার সরকার। এভাবে তালিকা প্রকাশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। জামায়াতের অভিযোগ, রিক্রুটিং এজেন্সিকে সিন্ডিকেটের আওতায় এনে সরকারের একটি অসাধু চক্র দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। আর এনসিপি বলেছে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা যাবে না।
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর গত জুনে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেই সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করে মালয়েশিয়া সরকারের অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় অভিবাসী কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা এফডব্লিউএমএস।
এরপর গতকাল শনিবার রাতে এনসিপি এবং আজ রোববার জামায়াত পৃথক বিবৃতিতে রিক্রুটিং এজেন্সির এই তালিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং এনসিপির পক্ষ থেকে দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার ‘একটি সিন্ডিকেট ও ফ্যাসিস্টদের হাতে’ তুলে দিয়ে দেশের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন এবং রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে সরকারের একটি মহলের গভীর ষড়যন্ত্রের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয় জামায়াতের বিবৃতিতে। এতে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি পাঠানোর মাধ্যম কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সিন্ডিকেটের আওতায় এনে সরকারের একটি অসাধু চক্র দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। এর ফলে বায়রার (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি) সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।
জামায়াতের বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দিন আগে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের সরকার মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত একটি সিন্ডিকেট–ভিত্তিক শ্রমবাজারব্যবস্থা তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। অতীতেও সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে সিন্ডিকেট গঠনের ফলে সাধারণ শ্রমিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে এবং হাজার হাজার শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবারও আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই ব্যবস্থার কারণে একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যেতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে, যা একজন সাধারণ শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জন্য অত্যন্ত বড় বোঝা হবে।
বাংলাদেশে দুই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত বলে, এ জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিশেষ ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে গঠিত সিন্ডিকেট ভাঙতে বায়রার সদস্য এবং ভালো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করে প্রতারণা বন্ধ এবং হাজারো সাধারণ শ্রমিককে সম্ভাব্য শোষণ, অতিরিক্ত ব্যয় ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছে এনসিপি। তবে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটি বলেছে, অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা যাবে না।
গতকাল রাতে এক বিবৃতিতে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, মালয়েশিয়ার বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে কোন প্রক্রিয়া, মানদণ্ড ও ভিত্তিতে এসব এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে বাংলাদেশ সরকার মালয়েশিয়ার নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেশটির কাছে পাঠিয়েছিল। সেই তালিকা থেকে মাত্র ২৫টি এজেন্সি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও ভিত্তি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা জরুরি বলে মনে করে এনসিপি।
অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল উল্লেখ করে এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার নির্ধারিত ৭৯ হাজার টাকার বিপরীতে একজন কর্মীর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিদেশে যাওয়ার আশায় অনেক কর্মী জমিজমা বিক্রি, সহায়–সম্বল শেষ করা কিংবা ঋণ নিয়ে বিপুল অর্থের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয়েছেন।
এখন নতুন করে সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে কেন্দ্র করে একই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি হলে কর্মপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষ এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন বলে মনে করেন এনসিপির মুখপাত্র। বিবৃতিতে বলা হয়, বিদেশগামী কর্মীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ বন্ধ করতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

