নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলায় নগর ইউনিয়নে অবস্থিত পাঁচগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম ভবন সংকট দেখা দিয়েছে। একটি মাত্র ছোট টিনের দোচালা ঘরে গাদাগাদি করে চলছে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান। দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত বেহাল দশায় একদিকে যেমন ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম, অন্যদিকে বিদ্যালয়মুখী হওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। পিডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলেও, সরকার পতনের পর ঠিকাদার লাপাত্তা হয়ে যাওয়ায় নির্মাণকাজ পুরোপুরি থমকে আছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনের অভাবে তীব্র স্থান সংকটে ভুগছে বিদ্যালয়টি। একই সময়ে একাধিক শ্রেণির ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এক শ্রেণির পাঠদান চললে অন্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বসার জায়গা না থাকায় শিক্ষক-কর্মচারীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চতুর্থ শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের আঞ্চলিক ভাষায় জানায়, “স্কুলে কিতা আইতাম, বইতে পারি না, পড়তে পারি না, স্যারেরাও বইতে পারে না। এক ক্লাস করতে গেলে অন্য ক্লাসের ছাত্ররা বাইরে খাড়ইয়া থাকি। পরে আরেক ক্লাস শুরু অইলে আমরাও বাইরে খাড়ইয়া থাকি বা খেলা-ধুলা করতা থাহি। পরে স্যারেরা ডাইক্কা ডাইক্কা আনে, কয় আয় ক্লাসে আয়।”
সংশ্লিষ্ট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এরপর পিডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় ২০২২ সালে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা ফাউন্ডেশনসহ তিনতলা বিশিষ্ট নতুন ভবনে ছয়টি শ্রেণিকক্ষ থাকার কথা। টেন্ডার শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে, যা ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা নির্ধারিত ছিল। এখন পর্যন্ত শুধু পাইলিং ও কলামের সামান্য কিছু কাজ ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারের কোনো খোঁজ মিলছে না। মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সমাজসেবক মানিক তালুকদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই স্কুলটি দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই ঠেলা-ধাক্কার মধ্য দিয়ে চলছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনতলা ভবনের অনুমোদন হয় এবং কাজও শুরু হয়। প্রায় দুই বছর ধরে তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না। মাঝে পাইলিং করে কলামের জন্য লোহার খাঁচা তৈরি করা হলেও পরে দেখছি আর কোনো কাজ নেই।”
তিনি আরও বলেন, একটি ছোট টিনের ঘরে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এতে শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষকদেরও বসার জায়গা নেই। তিনি দ্রুত এই সমস্যার সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রামচরণ সরকার নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “২০১৮ সালে আমি স্কুলে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একটি দোচালা টিনের ঘরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। দুই শিফটেও ছোট টিনশেড ঘরে ছয়টি শ্রেণির ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। না পারি শিক্ষকদের বসতে দিতে, না পারি ছাত্র-ছাত্রীদের একসঙ্গে বসিয়ে পাঠদান করাতে।”
তিনি জানান, প্রায় দেড় কোটি টাকার এই প্রকল্পের মাত্র ৫ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে তার ধারণা। ঠিকাদারকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না এবং তিনি শুনেছেন পিডিপি-৪ প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি তিনি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে একাধিকবার অবগত করেছেন।
এ বিষয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিমেল কদর বলেন, “বিদ্যালয়টি যে কোনো রকমে চলছে, তা আমি অবগত আছি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কলামের কাজ শুরুর পর তা আর এগোয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেন এমন করছে তা জানা নেই। তাছাড়া পিডিপি-৪ প্রকল্পের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও জানান, পাঁচগাছিয়া ও নাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী প্রকল্প শুরু হলে হয়তো এ উপজেলার দুটি বিদ্যালয়ের ভবনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহীদুল আজম বলেন, “উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভবনের কাজ যাতে দ্রুত শুরু করা যায়, সেই লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।”
পড়ুন : সবকিছু বিবেচনা করে মক্কা চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী
সা/


