ঘরজুড়ে তখন আগুনের লেলিহান শিখা। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন বৃদ্ধা জরিনা বেগম। সঙ্গে তাঁর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলে ঠান্ডু মিয়া। একদিকে আগুন, অন্যদিকে ছেলেকে নিয়ে নিরাপদে বের হওয়ার উৎকণ্ঠা—শেষ পর্যন্ত চিৎকার করে ছেলেকে ঘর থেকে বের করে আনেন তিনি। প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই রাতের আতঙ্ক এখনো তাড়া করে ফিরছে তাঁদের।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মানিকপুর এলাকায় জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এই বৃদ্ধা ও তাঁর ছেলেকে মারধর, বসতঘর ভাঙচুর এবং পরে ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, জমি দখলের উদ্দেশ্যে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এমনকি বাড়ি না ছাড়লে মেরে গুম করে ফেলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার প্রতিকার ও নিরাপত্তা চেয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগটি তদন্তের জন্য থানায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (৩০আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন জরিনা বেগম। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় জমি কিনে সেখানে বসতবাড়ি করেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর কবরও ওই জমিতে দেওয়া হয়েছে।
জরিনা বেগম বলেন, “এই বাড়ি আমার স্বামীর। আমরা বহু বছর ধরে এখানে থাকি। যে জমি নিয়ে তারা দাবি করছে, সেই জায়গাতেই আমার স্বামীর কবর রয়েছে। আমাকে এক সপ্তাহের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। না গেলে মেরে গুম করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে একা থাকি। অন্য ছেলেরা ঢাকায় চাকরি করে। এই সুযোগে আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
জরিনা বেগমের মেয়ে হোসনে-আরা বেগম আদালতে দেওয়া অভিযোগে আটজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিলেন।
আদালতে দেওয়া অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—সেকান্দার ব্যাপারী (৫০), এসকান্দার ব্যাপারী (৪৫), বেলায়েত তালী (২০), নাদিম তালী (২০), ইদ্রিস তালী (৫৫), নূর ইসলাম তালী (৩০), আনোয়ারা বেগম (৫৫) ও ফাতেমা বেগম (৪৫)।
অভিযোগে বলা হয়, গত ২১ আগস্ট রাতে কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র—রামদা, ছেনদা ও লোহার রড নিয়ে তাঁদের বসতবাড়িতে ঢোকেন। এ সময় জরিনা বেগমকে গালিগালাজ করা হয়। প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হয়। এমনকি হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে ঠান্ডু মিয়াকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা এবং পরে লোহার রড ও বাঁশের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করার অভিযোগও রয়েছে।
পরিবারের দাবি, ওই হামলায় জরিনা বেগম ও ঠান্ডু মিয়া আহত হন। তাঁদের শরীরে এখনো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
শুধু মারধরেই ঘটনা থামেনি বলে অভিযোগ পরিবারের। তাঁদের দাবি, হামলাকারীরা বসতঘরের টিনের বেড়া ও চাল ভাঙচুর করেন। এতে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরদিন ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক একটার দিকে বসতঘরের চারপাশে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জরিনা বেগম চিৎকার শুরু করেন। পরে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ছেলেকে ঘর থেকে বের করে আনেন তিনি।
বৃদ্ধা জরিনা বেগমের ভাষায়, “আগুন লাগার পর আমি শুধু ছেলেকে কীভাবে বের করব, সেটাই ভাবছিলাম। আল্লাহর রহমতে দুজনই বের হতে পেরেছি। এখন রাত হলেই ভয় লাগে।”
স্থানীয় সালিশ লিটন মাতুব্বর বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি তাঁরা একাধিকবার মীমাংসার চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা কয়েক দফা সালিশ করেছি। বৃদ্ধ মহিলা প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে বাড়িতে থাকেন। তাঁর অন্য ছেলেরা ঢাকায় চাকরি করেন। স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তা মানা হয়নি। এরপর তাঁদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সালিশি শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছি। একজন বৃদ্ধ নারী ও তাঁর প্রতিবন্ধী ছেলের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটি আইনগতভাবে সমাধান করা উচিত। হামলা, ভয়ভীতি বা আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে এলাকায় আরও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের করা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত এসকান্দার ব্যাপারী। তিনি বলেন, “তাঁদের সঙ্গে আমাদের কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমরা তাঁদের মারধরও করিনি। এসব অভিযোগ মিথ্যা।”
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, “আদালত থেকে অভিযোগটি তদন্তের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা যাচাই করা হবে। তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পড়ুন:ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন
ইমি/


