বিজ্ঞাপন

নাম বদলে সিনেমা জমা, মনজুরুল ইসলাম মেঘের জালিয়াতি

আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট পরিচালক মনজুরুল ইসলাম (মেঘ) সরকার পতনের মধ্য দিয়ে ভোল পাল্টে কখনো জামায়াতের নাম ব্যবহার আবার কখনো সুযোগ বুঝে আশ্রয় খোঁজেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে। দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা ও এক সময়ের অভিনেতার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটস্থ রাখেন ব্যক্তি থেকে সরকারি দফতরগুলোকেও। আর এমন এক দফতর হচ্ছে সার্টিফিকেশন বোর্ড। এ দফতরে ছয়টি চলচ্চিত্র জমা দিয়েছিলেন। আর সদ্য যাচাইবাছাই শেষে বোর্ড কর্তৃক বাতিল হয়েছে ছয়টি সিনেমাই!

জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই সিনেমাগুলো জমা দেন এক সময় আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী পরিচয়ের এই মনজুরুল ইসলাম মেঘ। ছয় সিনেমা জমা দেওয়ার সুখবর তখন দু-একটা গণমাধ্যমে দেন এই নির্মাতা।

বাতিল প্রসঙ্গে অভিযোগ- মানহীন, দুর্বল সংলাপ, অভিনয়, অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, অসামাঞ্জস্য কাহিনী বিন্যাস এবং পূর্বে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত দুটো সিনেমা নাম পরিবর্তন করে জমা দেওয়ার কারণে মনজুরুল ইসলাম মেঘের ছয়টি সিনেমা অপ্রদর্শনযোগ্য বলে বোর্ড চিঠি মারফত তাকে জানিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এই ব্যাপারে কৈফিয়ত তলব করেছে বোর্ড।

গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ সার্টিফিকেশন বোর্ডের উপপরিচালক (সচিব) মো. মইনউদ্দিন সাক্ষরিত এক পত্রে এই অভিযোগ এনে কৈফিয়ত তলব করা হয়।
সাবেক ছাত্রলীগের এই নেতার বিরুদ্ধে ২৭ আগস্ট বোর্ড কর্তৃক জারি হওয়া পত্রে অভিযোগ আনা হয়, মনজুরুল ইসলাম মেঘ প্রযোজিত ৬ টি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্রগুলি হলো (ক) পরিনাম- চধুনধপশ পরিচালক মঈনউদ্দিন খান, (খ) রঙ্গশালা-পরিচালক পীযুক কান্তি সেন, (গ) রক্ত পিপাসা- পরিচালক সজিব হোসেন, (ঘ) রসু খাঁ- পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু, (ঙ) পাহাড়ের আর্তনাদ- পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু, (চ) বনদস্যু- পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু, নামের ছয়টি চলচ্চিত্র গত ৩০ জুলাই ২০২৬ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডে সার্টিফিকেশনের জন্য জমা দেন।

এতে আরো বলা হয়, পরিনাম চলচ্চিত্রটিও ৩০ জুলাই জমা পড়ে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট বোর্ড যাচাইবাছাই শেষে সদস্যগণ অসংলগ্নতা খুঁজে পান। তারা, চিত্রনাট্য, কাহিনী বিন্যাস, শব্দ চয়ন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ সংলাপ, দৃশ্যায়ন যা কোন কিছুর সঙ্গে মিল নেই। অপ্রাসঙ্গিক, মানহীন, মদ্যপান, ধুমপান আর দুর্বল নির্মাণ উল্লেখ করে এই ধরনের সিনেমাকে ভালো কিছুর পরিবর্তে সমাজে কুফল বয়ে আনবে বলে মত প্রকাশ করেন। যে কারণে সার্টিফিকেশন অ্যাক্ট ২০২৩ এর ৫(১২) ধারা অনুযায়ী এটিকে সার্টিফিকেশন অযোগ্য বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

রঙ্গশালা গত ১৩ আগস্ট জমাকৃত এই চলচ্চিত্রটিকে দেখে কমিটি একমত হয়- এটিকে মানহীন ভিডিও কনটেন্ট বলা গেলেও কোনোভাবেই চলচ্চিত্র বলা যায় না। তাই ২০২৩ এর ৫(১২) ধারা অনুযায়ী এটিকে প্রদর্শন অযোগ্য বা বাতিল করা হলো।

রক্ত পিপাসা ১৬ আগস্ট যাচাইবাছাই শেষে বোর্ডের মুল্যায়ন চলচ্চিত্রটি কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ, চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রের বিকৃত মানসিকতা ও পাশবিকতা নির্ভর দৃশ্যায়ন করা হয়েছে; যা দর্শক বিরক্তির উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট এবং পশুবৃত্তকে উসকে দেয়। গল্প ও উপস্থাপন বিবেচনায় এটিকে কোনোভাবেই চলচ্চিত্র বলা যায় না। তাই ২০২৩ এর ৫(১২) ধারা অনুযায়ী এটিকে প্রদর্শন অযোগ্য বা বাতিল করা হলো।

পাহাড়ের আর্তনাদ গত ১৭ আগস্ট যাচাইবাছাই শেষে বোর্ড সদস্যরা নিশ্চিত হন এটি ২০২২ সালে সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ‘জমজ ভূতের গল্প’ সিনেমার সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে। কেবল প্রযোজক, প্রযোজক প্রতিষ্ঠানের নাম এবং চলচ্চিত্রের নাম পরিবর্তন করে জমা দিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম মেঘ। যা গুরুতর প্রতারণার সামিল। এ ব্যাপারে কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়েছে বোর্ড। একইসাথে চিঠি প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে বিবাদী চাইলে আপিল করতে পারবেন সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

মেঘ কর্তৃক বনদস্যু জমা দেওয়ার পর গত ১৮ আগস্ট যাচাইবাছাই করে বোর্ড সদস্যরা। এতে প্রকাশ্যে আসে মেঘের ভয়াবহ জালিয়াতির খবর। ২০২৩ সালে সার্টিফিকেশন প্রাপ্ত ‘আমার অরণ্য’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে কাহিনী, সংলাপ এমনকি দৃশ্যের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে জমাকৃত চলচ্চিত্র ‘বনদস্যু’র। যা প্রতারণার সামিল। সার্টিফিকেশন নিয়ম অনুযায়ী যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে বোর্ড চলচ্চিত্রটিকে বাতিল করে প্রযোজকের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানিয়ে নোটিশ জারি করা হয়।

সর্বশেষ রসু খাঁ চলচ্চিত্র নিয়ে ১৮ আগস্ট বোর্ডের মুল্যায়ন গল্প, চিত্রনাট্য, অভিনয়, সঙ্গীত কোনো কিছুতেই প্রতীয়মান হয় না এটা চলচ্চিত্র। এটিকে মানহীন ভিডিও কনটেন্ট বলা গেলেও কোনোভাবেই চলচ্চিত্র বলা যায় না। তাই ২০২৩ এর ৫(১২) ধারা অনুযায়ী এটিকে প্রদর্শন অযোগ্য বা বাতিল করা হলো।

প্রথম তিনজন পরিচালকের এটাই প্রথম পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অপরদিকে বাকি তিনটা পরিচালক মিজানুর রহমান লাবু বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিনেমা কিং। আর এতে করে উঠে এসেছে সিন্ডিকেট জালিয়াতি। এ নিয়ে মিজানুর রহমান লাবুর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। একইভাবে নাম উঠে এসেছে এম কে প্রডাকশনের পিযুষ সেন নামের একজনের। তার প্রতিষ্ঠানের মানহীন কনটেন্টগুলোই মেঘ নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে পিযুষ সেনও এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার মুঠোফোনে এ নিয়ে জানতে চেষ্টা করা হলেও তিনিও সাড়া দেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পরিচালক জানিয়েছেন শুধু মনজুরুল ইমলাম মেঘ একা নন, তার সঙ্গে আরো কয়েকজন এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত। আর পরিচালক মিজান জেনেবুঝেই তার পূর্বের সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত সিনেমার নতুন নামে জমা দিতে সাহায্য করেছেন। তাই তার বিরুদ্ধেও সার্টিফিকেশন বোর্ড ব্যবস্থা নিবে এটাই প্রত্যাশা করি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিচালক সমিতির এক নেতা জানিয়েছেন, সার্টিফিকেশন বোর্ড এ ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে তদন্তপূর্বক নাম প্রকাশ করে চিঠি ইস্যু করলে সমিতি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে।

এ ব্যাপারে জানতে সার্টিফিকেশন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের মুঠোফোনে রবিবার সন্ধ্যায় যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : সিনেমা নাকি সিরিজ— ফারিণকে নিয়ে কী করছেন অমিতাভ রেজা?

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন