লিওনেল মেসির বিদায়ের ঘোষণা মেনে নিতে পারছে না আর্জেন্টিনা। বুয়েনস এইরেসের দেয়ালে আঁকা মেসির প্রতিকৃতি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকদের বার্তা, সবখানেই এখন কৃতজ্ঞতা, শূন্যতা আর চোখের জল।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া আবেগঘন চিঠিতে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। দীর্ঘদিন ধরে যে মুহূর্তটির আশঙ্কা করছিলেন দেশটির মানুষ, শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো। শেষ হলো আকাশি-সাদা জার্সিতে তার ২১ বছরের পথচলা।
ঘোষণার পর থেকেই আর্জেন্টিনাজুড়ে মেসিকে ঘিরে আবেগ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী বুয়েনস এইরেসে তার প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে গেছে মেসির গোল, বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরা এবং জাতীয় সংগীতের সময় সতীর্থদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার পুরোনো ভিডিওতে।
বুয়েনস এইরেসের বেলগ্রানো এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী ফ্রান্সিসকা মিয়েথ বলেন, ‘মেনে নেওয়া কঠিন হবে। একটি দেশ হিসেবে তিনি আমাদের যে আনন্দ দিয়েছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।’
একই এলাকার বাসিন্দা হোসে আরামবুর কাছে মেসির সবচেয়ে বড় অবদান শুধু বিশ্বকাপ কিংবা গোলের রেকর্ড নয়। তার মতে, সমালোচনা ও ব্যর্থতার পরও হাল না ছেড়ে একটি স্বপ্নের পেছনে ছুটে যাওয়ার শিক্ষা দিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
২০২৬ বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার শহরগুলো যেন মেসিময় হয়ে উঠেছিল। বুয়েনস এইরেসের বিলবোর্ড, দেয়াল ও রেলস্টেশনে দেখা গেছে তাঁর ছবি। প্যাটাগোনিয়ার একটি শহরে তৈরি করা হয়েছিল মেসির প্রায় ৮৫ ফুট উঁচু ভাস্কর্য। ৩৯তম জন্মদিনে রাস্তায় নেমে একসঙ্গে গানও গেয়েছিলেন সমর্থকেরা।
সেই মানুষটিই আর জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামবেন না। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন মেসির ঘোষণাকে বর্ণনা করেছে ‘একটি যুগের সমাপ্তি’ হিসেবে। স্থানীয় একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মনোবিদেরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতের কোনো ফুটবলারের ওপর যেন ‘পরবর্তী মেসি’ হওয়ার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
মেসির বিদায়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও। তাদের বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর যাত্রাটি উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। তোমার উত্তরাধিকার আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবে।’
মেসির সতীর্থদের বার্তাতেও ফুটে উঠেছে একই শূন্যতা। এনজো ফার্নান্দেজ জানিয়েছেন, পরবর্তী জাতীয় দল শিবিরে সামনে ১০ নম্বর জার্সি পরা মেসিকে দেখতে না পাওয়ার কথা তিনি কল্পনাই করতে পারছেন না। লাওতারো মার্তিনেজ স্মরণ করেছেন মাঠের বাইরের মেসিকে, যিনি সতীর্থদের শিখিয়েছেন ব্যর্থতার পরও হাল না ছাড়তে।
রদ্রিগো দি পল মেসিকে ‘চিরন্তন’ উল্লেখ করে লিখেছেন, তিনি আর্জেন্টিনার মানুষের মুখে অসংখ্য হাসি এনে দিয়েছেন। আর ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো আনহেল দি মারিয়ার বার্তা, মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলতে দেখার জন্য তিনি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন।
আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেসির সম্পর্ক সব সময় এতটা সহজ ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপ ও টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর তাকে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০১৬ সালে একবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তখন দেশজুড়ে তাকে ফেরানোর দাবি উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন তিনি।
এরপর বদলে যায় পুরো গল্প। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জেতেন মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে রেকর্ড ১২৫ গোল করে বিদায় নিলেন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারের ম্যাচটিই হয়ে থাকল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ উপস্থিতি। রূপকথার মতো সমাপ্তি হয়নি। তবু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে সেই হার মেসির দুই দশকের গল্পকে ম্লান করতে পারেনি।
১০ নম্বর জার্সিতে আবার কেউ মাঠে নামবেন। আর্জেন্টিনাও নতুন করে পথ চলবে। কিন্তু জাতীয় সংগীতের সময় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচিত সেই মুখটি আর দেখা যাবে না। সেই বাস্তবতাই এখন কাঁদাচ্ছে পুরো আর্জেন্টিনাকে।
পড়ুন:জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
ইমি/


