প্রায় ১৭ হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের অন্যতম ভরসা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। আবাসিক হলের সংকট থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে এ পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন পুলে বর্তমানে ৪৯টি গাড়ি রয়েছে। তবে এ পরিবহনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও তেল নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর পরিবহন খাতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে জ্বালানি খাত থেকেই বছরে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়ির চলাচলের দূরত্ব বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয় না। চালক ও পেট্রোল পাম্পের কর্মীদের যোগসাজশে কম জ্বালানি সরবরাহ করে বেশি টাকার ভাউচার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে এমন অনিয়মের একটি ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন শাখার মাইনুদ্দিন নামের এক চালককে জ্বালানি সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে ক্যামেরার ফুটেজ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দেখানো হলে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন। এ সময় তাঁকে সাংবাদিকদের কাছে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতেও দেখা যায়।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ভাউচারের মাধ্যমে গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ করার নিয়ম রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, পাম্পের কিছু কর্মচারী চালকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভাউচারে উল্লেখ করা পরিমাণের চেয়ে কম জ্বালানি সরবরাহ করেন। এ বিষয়ে পেট্রোল পাম্পের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্য জানতে চাইলে তাঁরা কোনো মন্তব্য না করে দ্রুত সরে যান।
অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে প্রশাসন
পরিবহন খাতে তেল নয়ছয়ের অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক মো. তারিক বিন আতিক বলেন, “বাসের তেল চুরি-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ আমাদের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখি। তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণও পেয়েছি।”
তিনি বলেন, “বিগত সময়ে পরিবহন সেক্টরে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে পরিবহন খাতে ব্যয় কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা অনেকাংশেই সফল হয়েছি।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নজরদারির ঘাটতি থাকলে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিটি গাড়ির চলাচল, মাইলেজ ও জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব নিয়মিত যাচাই এবং সরবরাহের সময় যথাযথ তদারকি করা হলে অনিয়ম কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা তাঁদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পরিচালিত হলেও এ খাতে অনিয়ম হলে শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। তাঁদের দাবি, জ্বালানি কেনাকাটা ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত, কতদিন ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে এবং এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত—তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এরই মধ্যে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ভবিষ্যতে পরিবহন খাতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
পড়ুন : পাবনায় ৯ ফুট উঁচু গাঁজা গাছসহ গ্রেপ্তার ১ এবং মোবাইল কোর্টে ৫ মাদকসেবীর কারাদণ্ড


