খেলাপি কম দেখাতে ঋণ পুনঃতপশিলে একের পর এক ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ধ কারখানা সচল করতে বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। এতসব উদ্যোগের মধ্যে খেলাপি ঋণ না কমে আরও বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বেড়ে ফের ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট ঋণের যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে খেলাপি ঋণের এ হার বিশ্বের যে কোনো দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকৃত চিত্র সামনে আনায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ এ পর্যায়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে অনিয়ম জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা পলাতক। কেউ কেউ জেলে আছেন। নানা কৌশলে খেলাপি ঋণ গোপনের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত চিত্র সামনে আনার ওপর জোর দেয়।
উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমেছে। ২০২৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৬টি লভ্যাংশ দিতে পেরেছে। ২০২৬ সালের জন্য লভ্যাংশ দেওয়ার নিয়ম আরও কড়াকড়ি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে কোনো ব্যাংকে ১০ শতাংশের বেশি খেলাপির পাশাপাশি পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকার কম হলে আর নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তিন মাস আগে গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা বা ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত ছয় মাসে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকার খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখানোর উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকে হুহু করে বাড়তে থাকে। দেশে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় ২০২৫ সালের জুনে। ওই সময় খেলাপি ঋণ ঠেকেছিল ছয় লাখ আট হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। পরের ত্রৈমাসিকে আরও বেড়ে ছয় লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে ওঠে। এভাবে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকলে নানা আলোচনা শুরু হয়। তখন বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃতপশিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে না এলে যত মুনাফা হোক লভ্যাংশ দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে ঋণ পরিশোধে ব্যাংকগুলো তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। গত বছরের শেষ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমে যায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। পরে খেলাপি ঋণ বাড়তে বাড়তে ২০২৩ সাল শেষে এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় ওঠে। মোট ঋণের যা ৯ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ওই বছরের জুনভিত্তিক খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে দেখা যায়– তিন মাসে ৬৬ হাজার কোটি টাকা বেড়ে দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা হয়েছে। এরপর খেলাপি ঋণ বেড়েছে দ্রুতগতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন কৌশলে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো। কখনও বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ পুনঃতপশিল বা পুনর্গঠন, কখনও আদায় না করেও নিয়মিত দেখানো, কিংবা বাড়তি সময় দেওয়া হতো। খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সবচেয়ে বড় চুরির সুযোগ দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। সাধারণভাবে ঋণ পরিশোধের সময় পার হলেই মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হয়। তবে ওই বছর থেকে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের ছয় মাস পর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ হিসাব করা হচ্ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এটা বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন আবার একই রকম দাবি তুলেছেন কেউ কেউ। যদিও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোরতার পরিবর্তে একের পর এক ছাড়ের পথে হাটছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান না করেই বন্ধ কারখানা সচলের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে নীতি সুদহার কমানো হয়েছে। একক গ্রাহকের ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ গত সোমবারের এক নির্দেশনার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়। যে কোনো অঙ্কের ঋণে ইতোমধ্যে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড নিয়েছেন, তারাও এখন দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড তথা কিস্তি না দিতে বাড়তি এক বছর সময় নিতে পারবেন। এসব সুবিধার জন্য আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে বড় ঋণখেলাপিদের বড় অংশই অর্থ পাচারসহ নানা অপরাধে পলাতক থাকায় নিয়মিত করার জন্য খুব একটা সাড়া মিলছে না। আবার বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকটের কারণে কম সুদের প্রণোদনার ঋণ দিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।
পড়ুন:নিটল-নিলয় গ্রুপ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
ইমি/


