হরমুজ প্রণালিতে সামরিক বাহিনী মোতায়েন কিংবা সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোনো অভিযানে অংশ না নিতে দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক করেছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক উপস্থিতিকে কেবল নিরাপত্তা সহযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। বরং এটিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সমর্থন হিসেবে দেখা হবে। এর পরিণতি ‘গুরুতর’ হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে দেশটি।
এমন সময়ে ইরানের এই বার্তা এলো, যখন হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কঠিন সমীকরণে সিউল
শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রচেষ্টায় ‘অবদান’ রাখার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে। তবে সিউল একই সঙ্গে জানিয়েছে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা যেন তাদের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত না ঘটায়। ফলে এখনো সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়নি দক্ষিণ কোরিয়া।
বর্তমান অবস্থানে সিউলকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা উদ্যোগে সহযোগিতা বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়িয়ে চলতে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে এই সমীকরণ আরও স্পর্শকাতর। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে সংঘাত বাড়লে সামরিক ঝুঁকির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টিও সিউলকে বিবেচনায় নিতে হবে।
ইরানের বার্তা শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নয়
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও ভয়ভীতির’ কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, হরমুজে কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতিকে নিরপেক্ষ নিরাপত্তা উদ্যোগ হিসেবে দেখবে না তেহরান।
সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারীদের আগেই ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে সতর্ক করে নিরুৎসাহিত করাই ইরানের এই অবস্থানের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতীয়মান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর সামরিক উপস্থিতিও হরমুজে যুক্ত হোক—এটি তেহরান চায় না।
তবে এই অবস্থানের বিপরীত প্রভাবও তৈরি হতে পারে। কোনো মিত্র দেশকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হলে সেটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দিকে যেতে পারে। ফলে ইরানের সতর্কবার্তা একদিকে সামরিক অংশগ্রহণ ঠেকানোর চেষ্টা হলেও অন্যদিকে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণও হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব এর ভৌগোলিক আয়তনের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এই জলপথে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ইরান যদি আগের মতো অবাধ নৌচলাচল পুনরায় চালু না করার অবস্থান ধরে রাখে, তাহলে বাজারে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, বীমা খরচ এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তায়।
এ কারণে হরমুজে সামরিক উপস্থিতির প্রশ্নটি এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় তারা সামরিক ভূমিকা নেবে, নাকি সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে দূরত্ব বজায় রাখবে।
সামনে যে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে। প্রথমত, হরমুজে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে যুক্তরাষ্ট্র কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য মিত্র দেশ কতটা সামরিক সম্পৃক্ততায় যেতে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, হরমুজে নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের বর্তমান অবস্থান ইরান কতদিন ধরে রাখে।
সিউল শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে সামরিকভাবে যুক্ত হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া দূরে থাকলে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা প্রচেষ্টার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কোনো ভুল হিসাব বা সামরিক মুখোমুখি অবস্থান দ্রুত একটি আঞ্চলিক সংকটে রূপ নিতে পারে। কারণ একই জায়গায় নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থ একত্রিত হয়েছে।
ফলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ইরানের দেওয়া সতর্কবার্তা শুধু একটি দেশের প্রতি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হরমুজকে ঘিরে সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে কোন দেশ কোন পক্ষের পাশে দাঁড়াবে, সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক লড়াইয়েরও ইঙ্গিত রয়েছে এতে।
পড়ুন: শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন ১৬ ডিসেম্বর: বিমানমন্ত্রী
আর/


