ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দিনে দুবার মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করার অভিযোগ তুলে ওমান উপসাগর ও খার্গ দ্বীপের কাছে এসব হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। এর জবাবে জর্ডানে থাকা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। জর্ডান বলেছে, এর মধ্যে ১৮টি ধ্বংস করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়ল। এর মধ্যেই দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালাল। মূলত ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ জারি রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে মঙ্গলবারের (৮ সেপ্টেম্বর) এই সংঘাতের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠেছিল।
এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত দুই দিনে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুবার হামলার চেষ্টা করেছিল। তবে জাহাজটি ‘সফলভাবে ইরানের হামলা এড়িয়ে যায়’। সেন্টকম বলেছে, ‘কোনো মার্কিন সেনা বা কর্মী আহত হননি।’
এরপর পাল্টা জবাবে ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে সেন্টকম। হামলা চালানো ট্যাংকারগুলো হলো এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন-১ ও এম/টি রিয়েস্কো। এগুলো ওমান উপসাগরে ছিল। এছাড়া খার্গ দ্বীপের কাছে এম/টি দেরিয়া নামের আরেকটি ট্যাংকারেও হামলা চালানো হয়।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, হামলার আগে মার্কিন বাহিনী জাহাজগুলোর কর্মীদের সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেয়া হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি খার্গ দ্বীপের কাছে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমে হতো। আইআরআইবি জানিয়েছে, হামলার পর জাহাজের কর্মীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওমান উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক বন্দরের কাছেও আরেকটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে বলে জানায় তারা।
আইআরজিসিও জানিয়েছে, ইরানের ‘বেশ কয়েকটি’ বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। এর জবাবে জর্ডানে থাকা আল-আজরাক ঘাঁটিতে ‘তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালানোর দাবি করেছে তারা। হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার জন্য ব্যবহৃত হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি।
এর আগে মার্কিন নৌবাহিনীর ডিডিজি-১১৯ ও ডিডিজি-৫৩ ডেস্ট্রয়ারে চালানো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথাও উল্লেখ করেছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, ওই হামলায় জাহাজ দুটিতে ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।
এদিকে কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতেও হামলার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি। সেখানে থাকা জাহাজের কর্মীদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
আইআরজিসি বলেছে, ‘কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা সব তেলবাহী ট্যাংকারের কর্মীদের আমরা সতর্ক করছি—জাহাজ নোঙর করা থাকুক বা বন্দরে থাকুক, অবিলম্বে তা ছেড়ে যান। কারণ এসব জাহাজ হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে।’
অন্যদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের ছোড়া ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করেছে এবং এর মধ্যে ১৮টি ‘সফলভাবে শনাক্ত করে ধ্বংস করেছে’। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ‘জনবসতিহীন এলাকায়’ পড়েছে।
জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এসব হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ও ছোড়া ধাতব অংশ যেখানে পড়েছে, সেসব এলাকা নিরাপদ করতে বিশেষ দল কাজ শুরু করেছে।
এর আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা হলে পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাবে তেহরান।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আবদোল্লাহি বলেন, ‘আগ্রাসী মার্কিন বাহিনী ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে হামলার আগে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাই আমি ঘোষণা করছি, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে যেকোনো হামলার জবাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের জাহাজে হামলা চালিয়ে যাবে। কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘ইরান এখনো মার্কিন নৌজাহাজে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যতবার এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবারই তাদের একটি করে ট্যাংকার হারাতে হবে।’
পড়ুন : ইতালিতে বাঁধনের ওপর হামলা: জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার


