বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই। গ্যাস আছে, কিন্তু চাপ নেই। দুই সংকটের চাপে থমকে যাচ্ছে শিল্প, বাড়ছে উৎপাদন খরচ, আর বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট। চলমান এই সংকটের দায় নিয়ে সরকারবিরোধীরা সরাসরি আঙুল তুলছেন বর্তমান সরকারের দিকে। আদতে দায় কার?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনা, আমদানিনির্ভরতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতি এবং বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
গত এক যুগে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্থাপিত সক্ষমতা ৭ হাজার ২৬৪ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২৮ হাজার ৯৮ মেগাওয়াট হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৪৭৭ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলোর বড় অংশ চালানোর মতো জ্বালানি নেই। কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুতের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। দেশে প্রতিদিন গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সিপিডির তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে দেশে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ২৪ হাজার ৯৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ২১ হাজার ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। ঘাটতি মেটাতে বেড়েছে এলএনজি আমদানি। ২০২০ অর্থবছরে মোট গ্যাস সরবরাহে এলএনজির অংশ ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের শুরুতে বেড়ে প্রায় ২৫ শতাংশে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের সরকারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতিতে চাহিদার তুলনায় বেশি বিদ্যুৎ সক্ষমতা তৈরি হলেও নিশ্চিত করা হয়নি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ। এর ফলে বেড়েছে ক্যাপাসিটি পেমেন্টের বোঝা।
আইইইএফএর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে রিজার্ভ মার্জিন ছিল ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা ছিল অনেক বেশি। একই সময়ে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল আমদানিনির্ভর। অথচ গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বা সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনীতিতে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প বাতিলের উদ্যোগ নেয় তারা। ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইনের আওতায় নেওয়া বেশ কিছু প্রকল্প বাতিল হয়। সিপিডির তথ্যমতে, এর মধ্যে ছিল ৩৭টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প, যার সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার ১০২ মেগাওয়াট।
আগের সরকারের আমলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া অনুমোদন পাওয়া এসব প্রকল্পে উচ্চমূল্য ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় বাতিলের পক্ষে যুক্তিও ছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, প্রকল্পগুলোর কিছু চালু থাকলে ২০২৬ সালে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হতে পারত।
একই সময়ে বাতিল হয় নতুন এলএনজি টার্মিনালের উদ্যোগও। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে আরেকটি টার্মিনালের সমঝোতাও বাতিল হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হতে পারত। যদিও শুধু টার্মিনাল নির্মাণই স্থায়ী সমাধান নয়; প্রয়োজন ছিল গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী কাতারও ২০২৬ সালের নির্ধারিত সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
এরপর জুলাইয়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগায় সেটি দুই সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকে। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে আংশিক চালু হলেও জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস যোগ হচ্ছিল মাত্র প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাপ পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।
তাহলে কি মাত্র ছয় মাসের বিএনপি সরকারকেই এই সংকটের জন্য দায়ী করা যায়? জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম তামিমের মতে, বর্তমান সংকট কোনো একটি সরকারের রাতারাতি তৈরি করা সংকট নয়। তাই বর্তমান সরকারকে এককভাবে দায়ী করারও সুযোগ নেই।
তবে সংকট সমাধানে বর্তমান সরকারের করণীয়ও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ – দ্রুত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো নয় – বরং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরী। আর দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে টেকসই সমাধানের একটি পথ।
পড়ুন : আগামীকাল ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়
ভিডিও :


