বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্রের বদলে করপোরেট রাজতন্ত্র, ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ারদের নতুন বিশ্ব

বিজ্ঞাপন

দানিয়ুব নদীর তীরে কাদা ও গাছে ঘেরা এক টুকরো জমি। নাম ‘ফ্রি রিপাবলিক অব লিবারল্যান্ড’। নৌকা থেকে দেখলে জায়গাটিকে অত্যন্ত সাধারণ মনে হয়। কিন্তু পুঁচকে এই ভূখণ্ডটির পেছনে জড়িয়ে আছেন ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসার সবচেয়ে বড় অর্থায়নকারীসহ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনীরা।

বিখ্যাত স্থপতি সংস্থা ‘জাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস’-এর ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি নকশায় এই লিবারল্যান্ডেরই এক ঝলক দেখা যায়—যেখানে রয়েছে ভাসমান পার্ক, ঝলমলে বহুতল ভবন আর মাধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখানো ওয়াটার পার্ক। লিবারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ভিট জেডলিকা এটিকে একটি সম্পূর্ণ ‘ডিজিটাল ও ট্যাক্সমুক্ত’ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চান, যার সব কার্যক্রম চলবে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রযুক্তির মাধ্যমে।

বিবিসি টু-এর অনুসন্ধানমূলক প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য টেক বিলিয়নিয়ার টেকওভার’-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ক্রিপ্টো কোটিপতিরা কীভাবে প্রথাগত সরকারব্যবস্থাকে সরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বিশ্ব গড়তে চাইছেন। চলুন জেনে নেই কীভাবে সেই নতুন বিশ্ব গড়ছেন ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়াররা।

সাধারণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের ভোটের অধিকার থাকে। কিন্তু লিবারল্যান্ডের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে ‘লিবারল্যান্ড মেরিটস’ নামের একটি ক্রিপ্টো টোকেন কেনা যায়। প্রেসিডেন্ট জেডলিকা জানান, যাঁর কাছে যত বেশি ‘মেরিটস’ বা টোকেন থাকবে, দেশের নেতৃত্ব নির্বাচনে তাঁর ভোটাধিকার বা প্রভাব তত বেশি হবে। এর অর্থ সহজ—টাকা দিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা ভোট কেনা সম্ভব।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রোট পার্লামেন্টের (ক্রোয়েশিয়ান) বিতর্কিত সাবেক সংসদ সদস্য ইভান পারনার জানান, লিবারল্যান্ডে কোনো কর দিতে হয় না। তবে দরিদ্রদের সাহায্য করাকে তাঁরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী মনে করেন। পারনার বলেন, ‘যদি আমরা যে কাউকে এখানে স্বাগত জানাই, তবে এটি যুক্তরাজ্যের মতো হয়ে যাবে। আমরা অলসদের সুবিধা দিতে চাই না, কারণ এতে তাদের নিজেদের উপার্জনের ক্ষমতা নষ্ট হয়।’

স্কচটেপ দিয়ে দেয়ালে আটকানো কলার ক্রেতা ও ট্রাম্পের অর্থদাতা জাস্টিন সান

লিবারল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চীনের ক্রিপ্টো দানব জাস্টিন সান, যার সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৮৫০ কোটি ডলার। ৬২ লাখ ডলারে স্কচটেপ দিয়ে দেয়ালে আটকানো কলা কিনে তা খেয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও বাজার কারসাজির অভিযোগ আনলেও ১ কোটি ডলারের বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।

জাস্টিন সানের প্রতিষ্ঠিত ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রন’-এ প্রতিদিন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় এতে অবৈধ লেনদেন ও সন্ত্রাসী অর্থায়নের অভিযোগ থাকলেও সান তা অস্বীকার করে বিশ্বজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করার দাবি করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’-এ সানের বিনিয়োগের পরিমাণ সাড়ে ৭ কোটি ডলারেরও বেশি। পাশাপাশি ট্রাম্পের ‘মিমকয়েন’-এ লাখ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সান্ধ্যভোজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। হোয়াইট হাউসে প্রবেশের পর ট্রাম্প সেখান থেকে সরে দাঁড়ালেও তাঁর পরিবার এ ব্যবসা থেকে নিয়মিত বিপুল মুনাফা অর্জন করছে।

সীমানাহীন পৃথিবী নাকি প্রযুক্তির স্বৈরতন্ত্র

মহাকাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাস্টিন সান জানান, পৃথিবী মূলত কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয় এবং রাষ্ট্রভিত্তিক ধারণা এখন পুরোনো হয়ে গেছে। ব্লকচেইনের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থা পরিচালনার এ ধারণায় তিনি একা নন। হন্ডুরাসের ‘প্রসপেরা’, পিটার থিয়েলের ‘সিস্টেডিং ইনস্টিটিউট’ এবং টিম ড্রাপারের ‘ড্রাপার নেশন’-এর মতো ডিজিটাল বা মাইক্রো-নেশন প্রকল্পগুলো একই স্বপ্নে এগোচ্ছে।

এই মতবাদের মূল উৎস টেক-দার্শনিক কার্টিস ইয়ারভিন। তাঁর মতে, বিদ্যমান গণতন্ত্র ব্যর্থ এবং এটি এমন একটি ‘করপোরেট রাজতন্ত্র’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা দরকার, যেখানে কোনো কোম্পানি বা সিইও রাজা হিসেবে দেশ চালাবেন এবং বিনিয়োগকারীরা হবেন শেয়ারহোল্ডার বা নাগরিক।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কোটি কোটি ডলার ঢেলে ক্রিপ্টো লবি এখন জীবাশ্ম জ্বালানি খাতকেও পেছনে ফেলে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক অর্থদাতায় পরিণত হয়েছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টো কোটিপতিরা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সাধারণ মানুষকে ‘মুক্ত’ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে ক্ষমতার পুরো রাশ চলে যাচ্ছে কেবল সেই সব ব্যক্তিদের হাতে, যাঁদের কাছে রয়েছে প্রযুক্তি ও বিপুল অর্থ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন