স্মার্টফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষণের অন্যতম জায়গা। ছবি, ভিডিও, পরিচিত ব্যক্তিদের নম্বর, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ব্যাংকিং তথ্যসহ নানা ধরনের সংবেদনশীল তথ্য ফোনে রাখা হয়। ফলে স্মার্টফোনে ম্যালওয়্যারের আক্রমণ হলে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর অজান্তেই ফোনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ম্যালওয়্যার হলো এমন এক ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার, যা কোনো ডিভাইসে অনুপ্রবেশ করে তথ্য চুরি, নজরদারি কিংবা ডিভাইসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে। অনেক সময় এসব ম্যালওয়্যার সাধারণ অ্যাপ, গেম, ফাইল, ভুয়া লিংক কিংবা বিজ্ঞাপনের আড়ালে ফোনে প্রবেশ করে। ব্যবহারকারী বুঝতেও পারেন না যে তার ডিভাইসে ক্ষতিকর সফটওয়্যার সক্রিয় রয়েছে।
ভুয়া অ্যাপের মাধ্যমে প্রবেশ
ফোনে ম্যালওয়্যার ছড়ানোর অন্যতম পদ্ধতি হলো ভুয়া বা ক্ষতিকর অ্যাপ। অনেক সময় পরিচিত অ্যাপের নাম ও লোগো ব্যবহার করে নকল অ্যাপ তৈরি করা হয়। এসব অ্যাপ ইনস্টল করার পর ব্যবহারকারীর কাছে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, পরিচিতি, মেসেজ, স্টোরেজ কিংবা অন্যান্য তথ্য ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হতে পারে।
প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কোনো অ্যাপ যদি অতিরিক্ত অনুমতি চায়, তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত। কারণ অপ্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে ক্ষতিকর অ্যাপ ফোনের বিভিন্ন তথ্য অ্যাক্সেস করার সুযোগ পেতে পারে।
ফিশিং লিংকেও ঝুঁকি
ম্যালওয়্যার ছড়ানোর আরেকটি প্রচলিত মাধ্যম হলো ফিশিং লিংক। ই-মেইল, এসএমএস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মেসেজ কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আকর্ষণীয় অফারের কথা বলে ব্যবহারকারীকে লিংকে ক্লিক করতে বলা হয়।
কখনো বলা হয়, পুরস্কার জিতেছেন, আবার কখনো অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে দ্রুত লিংকে প্রবেশ করতে বলা হয়। ব্যবহারকারী সেই লিংকে গিয়ে কোনো ফাইল ডাউনলোড বা অ্যাপ ইনস্টল করলে ফোনে ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়তে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া ওয়েবসাইটে লগইন তথ্য দিলে সেটিও সাইবার অপরাধীদের হাতে চলে যেতে পারে।
কী ধরনের তথ্য চুরি হতে পারে
ম্যালওয়্যার ফোনে প্রবেশ করার পর তার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও, পরিচিতির তালিকা, এসএমএস, ই-মেইল, ডিভাইসের তথ্য এবং বিভিন্ন অ্যাপের ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য।
কিছু ম্যালওয়্যার ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য বা পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেও কাজ করে। বিশেষ করে ব্যাংকিং বা আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত তথ্য ঝুঁকিতে পড়লে ব্যবহারকারী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই ফোনে সন্দেহজনক কোনো কার্যক্রম দেখা দিলে সেটিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কীভাবে বুঝবেন ফোনে ম্যালওয়্যার আছে
ম্যালওয়্যার শনাক্ত করা সবসময় সহজ নয়। তবে ফোনে হঠাৎ অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যেমন—ফোন অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে যাওয়া, ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়া, ডেটা ব্যবহার হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কিংবা অপরিচিত অ্যাপ দেখা গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার।
এ ছাড়া বারবার অপ্রত্যাশিত পপ-আপ বিজ্ঞাপন আসা, ফোন অতিরিক্ত গরম হওয়া বা ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া কোনো অ্যাপের কার্যক্রম চালু হওয়ার মতো ঘটনা ঘটলেও সতর্ক হতে হবে। অবশ্য এসব লক্ষণের সবগুলোই ম্যালওয়্যার আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ নয়; অন্য কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে।
নিরাপদ থাকতে যা করবেন
স্মার্টফোনকে ম্যালওয়্যার থেকে নিরাপদ রাখতে প্রথমেই অপরিচিত উৎস থেকে অ্যাপ ইনস্টল করা এড়িয়ে চলতে হবে। অ্যাপ ডাউনলোডের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য অ্যাপ স্টোর ব্যবহার করা উচিত। কোনো অ্যাপ ইনস্টলের আগে সেটির নির্মাতা, রিভিউ এবং ডাউনলোডসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা ভালো।
ফোনের অপারেটিং সিস্টেম ও অ্যাপ নিয়মিত আপডেট করাও গুরুত্বপূর্ণ। সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে অনেক সময় নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা সংশোধন করা হয়। তাই আপডেটের নোটিফিকেশন এলে দীর্ঘদিন সেটি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
একই সঙ্গে কোনো অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে পুরস্কার, উপহার, চাকরি, জরুরি সতর্কবার্তা কিংবা অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার মতো বিষয় উল্লেখ করে পাঠানো অস্বাভাবিক মেসেজে থাকা লিংক নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অ্যাপের অনুমতি যাচাই করুন
ফোনে ইনস্টল করা অ্যাপগুলোকে কী কী অনুমতি দেওয়া হয়েছে, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। যে অ্যাপের কাজের সঙ্গে কোনো অনুমতির সম্পর্ক নেই, তাকে সেই অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
উদাহরণ হিসেবে, একটি সাধারণ টর্চ অ্যাপ যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে পরিচিতি, মাইক্রোফোন বা এসএমএসের অনুমতি চায়, তাহলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যাপের অনুমতি বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে এবং সন্দেহজনক অ্যাপ থাকলে সেটি আনইনস্টল করার কথা বিবেচনা করা উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখুন
ফোনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা উচিত। যেখানে সম্ভব, দুই স্তরের নিরাপত্তা বা Two-Factor Authentication (2FA) চালু করা যেতে পারে। এতে শুধু পাসওয়ার্ড জানা থাকলেই অন্য কেউ সহজে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে না।
পাশাপাশি ফোনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিয়মিত ব্যাকআপ রাখা ভালো। এতে ডিভাইসে কোনো সমস্যা হলে গুরুত্বপূর্ণ ছবি, নথি বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকে।
সতর্কতাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সাইবার অপরাধীদের কৌশলও তত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই শুধু নিরাপত্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। ব্যবহারকারীর সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অপরিচিত অ্যাপ, সন্দেহজনক লিংক, অস্বাভাবিক মেসেজ এবং অতিরিক্ত অনুমতি চাওয়া অ্যাপের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। ফোনে অস্বাভাবিক কোনো কার্যক্রম দেখা দিলে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, সন্দেহজনক অ্যাপ সরানো এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত। সচেতনভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করলেই ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পড়ুন:ইন্টারনেট ছাড়াই যেভাবে ব্যবহার করবেন গুগল ম্যাপ, জেনে নিন ৫ উপায়
ইমি/


