যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলিতে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার ঠিক আগে চ্যাটসওয়ার্থ এলাকার লারলাইন অ্যাভিনিউ ও নর্ডহফ স্ট্রিটের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
লস অ্যাঞ্জেলেস ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (এলএএফডি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হেলিকপ্টারটি দুটি বাণিজ্যিক ভবনের মাঝখানে বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং হতাহতদের উদ্ধারে কাজ শুরু করে।
এলএএফডির এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও একজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতালে নেওয়া ওই ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের বেশ কিছু অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দুটি শিপিং কন্টেইনার এবং আশপাশে থাকা কয়েকটি যানবাহনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ঢেকে যায়। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোর আশপাশে থাকা মানুষজন নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দুর্ঘটনার কারণে ওই এলাকায় জরুরি সেবা সংস্থার তৎপরতা বাড়ানো হয় এবং ঘটনাস্থলের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
এখনও পর্যন্ত হেলিকপ্টারটি কে চালাচ্ছিলেন এবং এতে মোট কতজন আরোহী ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানানো হয়নি। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি একটি সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। দুর্ঘটনার আগে এটি একটি গুরুতর বাস দুর্ঘটনার ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এলাকায় উড়ছিল বলে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার আগে হেলিকপ্টারটির গতিপথ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। তবে হেলিকপ্টারটি সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল কি না, সেটি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এলএএফডির ক্যাপ্টেন ব্র্যান্ডেন সিলভারম্যান এর আগে বিবিসির মার্কিন সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিবিএসের স্থানীয় শাখাকে জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার সময় হেলিকপ্টারের বাইরে থাকা একজনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তবে দুর্ঘটনার সময় হেলিকপ্টারের ভেতরে ঠিক কতজন ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
দুর্ঘটনার কারণও এখনো জানা যায়নি। হেলিকপ্টারটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে, নাকি আবহাওয়া, পাইলটের ভুল বা অন্য কোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। এসব বিষয় তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ (এলএপিডি) জানিয়েছে, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি তাদের কোনো হেলিকপ্টার নয়। ফলে এটি পুলিশ বিভাগের নিয়মিত বিমান অভিযানের অংশ ছিল না বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার তদন্তের নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি)। সংস্থাটির তদন্তকারীরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে হেলিকপ্টারের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করবেন। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, হেলিকপ্টারের উড্ডয়নপথ, যোগাযোগের তথ্য এবং সম্ভাব্য যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে।
এ ধরনের দুর্ঘটনার তদন্তে সাধারণত হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন, রোটর, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগে পাইলটের সঙ্গে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কোনো যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তকারীরা যাচাই করতে পারেন। হেলিকপ্টারটির ফ্লাইট রেকর্ড ও রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাসও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
দুর্ঘটনার পর লারলাইন অ্যাভিনিউ ও নর্ডহফ স্ট্রিটের আশপাশের এলাকায় জরুরি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ঘটনাস্থলে তদন্তকারীদের কাজের জন্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসে হেলিকপ্টার চলাচল তুলনামূলকভাবে সাধারণ ঘটনা। সংবাদ সংগ্রহ, জরুরি উদ্ধার, পুলিশি কার্যক্রম এবং অন্যান্য কাজে বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। তবে ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় কোনো হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে হতাহতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সর্বশেষ এই দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় শোক নেমে এসেছে। নিহতদের পরিচয় এবং হেলিকপ্টারে থাকা ব্যক্তিদের বিস্তারিত তথ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে পর্যায়ক্রমে জানানো হতে পারে।
এদিকে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এনটিএসবি তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তদন্তের প্রাথমিক তথ্য প্রকাশিত হলে হেলিকপ্টারটি কেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং দুর্ঘটনার আগে এর গতিপথে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। আপাতত কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নিহত ও আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনাস্থল নিরাপদ রাখা এবং হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ বের করা।
পড়ুন:ইসরায়েলের সামরিক শক্তি বাড়াতে ৪০ হাজার বোমা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইমি/


