গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলামকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক, সচেতন নাগরিক ও গাজীপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে।
বিদ্যালয় সূত্র ও জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিদ্যালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয়ের তহবিল ব্যবস্থাপনা, আর্থিক হিসাব, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ জমা না দেওয়া, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ নিয়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্তের জন্য গাজীপুর জেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়।
জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আল মামুন তালুকদারের স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুন ২০২৫ ও জুলাই ২০২৫-এর আয়-ব্যয়ের পর যথাক্রমে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৪ টাকা এবং ৬৪ হাজার ৩৫৮ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে হাতে রাখার অনিয়ম পাওয়া গেছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর আয়-ব্যয়ের পর ১ লাখ ২৩ হাজার ২২৯ টাকা হাতে রাখার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রশিদের মাধ্যমে আদায় করা ৯ হাজার ৯৩০ টাকা বিদ্যালয়ের আয় খাতে জমা না দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের মধ্যে ২৭ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ার বিষয়ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন ও জমার হিসাবেও ৬ হাজার ৯৪০ টাকার গরমিলের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাত মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গাজীপুর জজকোর্টে ১৪৩২/২৬ নম্বর মামলা চলমান রয়েছে। প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত ও মতামতে বলা হয়, মামলার রায় এবং সাময়িক বরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সিনিয়র শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা নেই বলেও মত দেওয়া হয়।
এদিকে বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির কার্যক্রম এবং নুরুল ইসলামের করা রিট ও পরবর্তী আদালতীয় কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয়দের দাবি, আদালতে মামলা চলমান থাকা এবং জেলা শিক্ষা অফিসারের তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের বিষয় উঠে আসার পরও তাকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা প্রতিবাদে নামেন।
মানববন্ধন চলাকালে নুরুল ইসলাম বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে উপস্থিত স্থানীয় জনতা ও বিএনপির নেতাকর্মীদের একাংশের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাকে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করেন।
এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিতদের জানান, নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে সহকারি শিক্ষক হিসেবে তিনি নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন বলে জানানো হয়।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম যেন নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং চলমান মামলা ও তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হয়।
পড়ুন : ধামরাইয়ে আড়াই কেজি গাঁজাসহ গ্রেপ্তার এক


